Ajker Patrika

২০২৫-২৬ অর্থবছর: সরকারের ঋণ সর্বোচ্চ, বেসরকারি সর্বনিম্ন

মৃত্তিকা সাহা, ঢাকা
২০২৫-২৬ অর্থবছর: সরকারের ঋণ সর্বোচ্চ, বেসরকারি সর্বনিম্ন

একদিকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের রেকর্ড পরিমাণ ঋণ, অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে ধস—দেশের ব্যাংকিং খাতে এখন এমনই বিপরীতমুখী চিত্র। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা, যা এক অর্থবছরে সরকারের নেওয়া সর্বোচ্চ ব্যাংকঋণ। একই সময়ে গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা এই খাতের ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংকঋণকে সরাসরি ‘ক্রাউডিং আউট’ বলা যাচ্ছে না। তবে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও ব্যবসার গতি ফিরলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়বে। তখনো সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে থাকলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে ঋণের সুদহার বেশি থাকার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ক্রাউডিং আউট হলো এমন একটি অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, যেখানে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এবং সাধারণ মানুষের খরচ কমে যায়। সহজ কথায়, সরকার যখন বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়, তখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। যার ফলে তারা বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, বর্তমানে সরকারের ব্যাংকঋণকে ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট বলা ঠিক হবে না। কারণ, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা এখন কম। তবে ভবিষ্যতে ঋণের চাহিদা বাড়লেও সরকার যদি ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকে, তখন ক্রাউডিং আউটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ জন্য রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাজেটে নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেছে। মূল বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা তো বটেই, পরবর্তী সময়ে সংশোধিত বাজেটে বাড়ানো সীমাও অতিক্রম করেছে সরকারের ব্যাংকঋণ। অর্থবছর শেষে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। এক অর্থবছরে সরকারের ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে এটিই সর্বোচ্চ। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। এদিকে চলতি অর্থবছরেও ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়া অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে সরকার প্রতিদিন প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে সরকারের বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে গতি নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে হয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। মে মাসে এই হার ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং এপ্রিলে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এমনকি করোনার চরম সংকটের সময়ও বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরে ছিল।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণস্থিতি ছিল ১৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ বেড়েছিল ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। অপর দিকে চলতি বছরের জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ গত ডিসেম্বর থেকে জুন—ছয় মাসে ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা বা মাত্র ২ দশমিক ০৭ শতাংশ।

এদিকে বেসরকারি খাতকে চাঙা করতে সম্প্রতি নীতি সুদহার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য হলো, ঋণের সুদ কমিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গতি ফেরানো।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ কমার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে ব্যবসার পরিবেশের ঘাটতি, গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, ঋণের উচ্চ সুদহার এবং সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ অন্যতম। তাঁর মতে, এত উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করা কঠিন। আবার সরকার যদি উচ্চ সুদে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রাপ্তি কমবেই। এসব মৌলিক সমস্যা সমাধান না করে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ দিলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ সৃষ্টি করার আশঙ্কা রয়েছে। যার ফলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে এবং ঋণের সুদহার তুলনামূলক বেশি থাকে। ফলে নতুন বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে। তাঁর মতে, রাজস্ব আহরণে দুর্বলতার কারণে সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ছে। টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংকঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা কমানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত