Ajker Patrika

অবৈধ পথে ইউরোপযাত্রা

সুনামগঞ্জের আরও ১৩ তরুণ জিম্মি লিবিয়ায়

  • ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের ১২ তরুণের মৃত্যুর খবর জানা যাচ্ছে।
  • পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতে গিয়ে নির্মমতার শিকার।
  • জনপ্রতি ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা নিয়েছে দালালেরা।
বিশ্বজিত রায়, সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জের আরও ১৩ তরুণ জিম্মি লিবিয়ায়
ভূমধ্যসাগরে ডুবে মারা যাওয়া শায়েক আহমদের বাবার আহাজারি। গতকাল সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের টিয়ারগাঁও গ্রামে। ছবি: আজকের পত্রিকা

স্বপ্নের ইউরোপের আশায় লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া অভিবাসনপ্রত্যাশী সুনামগঞ্জের তরুণের সংখ্যা আরও বাড়ছে। এবার জানা গেল এই জেলার ১০ জন নয়, ১২ তরুণের মৃত্যু হয়েছে।

পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতে দালালের লোভনীয় ফাঁদে আটকা পড়ে নির্মমতার শিকার হয়েছেন এই তরুণেরা। ধারদেনা করে জনপ্রতি ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা দালালের হাতে তুলে দিয়ে এখন সর্বস্বান্ত একেকটি পরিবার।

প্রিয়জনের মৃত্যুতে মাতম চলছে পরিবারে। সবকিছু হারিয়ে আপনজনের মৃতদেহও ছুঁয়ে দেখতে

না পারার আক্ষেপ তাঁদের কণ্ঠে। তবে দালালদের কঠোর সাজার দাবি জানিয়েছেন নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কেবল দিরাই, জগন্নাথপুর, দোয়ারাবাজারই নয়—জেলার প্রতিটি উপজেলাতেই দালালদের দৌরাত্ম্য রয়েছে। দালালদের খপ্পরে পড়ে লিবিয়ায় জিম্মি আছেন জামালগঞ্জের নাজিমনগর, নয়াহালট, কালীবাড়িসহ বিভিন্ন গ্রামের ১৩ তরুণ। দালাল চক্র জনপ্রতি ১৩ লাখ টাকা করে ইতালি যাওয়ার মৌখিক চুক্তি করে ভুক্তভোগী যুবকদের সঙ্গে। তাঁরা গত ২৮ জানুয়ারি বাড়ি থেকে বের হয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও মিসর হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান বলে জানা গেছে।

লিবিয়ায় জিম্মি থাকা জামালগঞ্জের যুবকেরা হলেন ফেনারবাঁক ইউনিয়নের নাজিমনগর গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে নিলয় মিয়া (২২), জলিল মিয়ার ছেলে আতাউর রহমান (২৯), শহীদ মিয়ার ছেলে মামুন মিয়া (২৭), রাশিদ আলীর ছেলে শফিকুল ইসলাম (৩২), বাচ্চু মিয়ার ছেলে এনামুল হক (২৬), এখলাছ মিয়ার ছেলে আমিনুল ইসলাম (২৫), ফয়জুন নূরের ছেলে মনিরুল ইসলাম (২৪), নূরু মিয়ার ছেলে ইয়াছিন মিয়া (৩০), জীবন মিয়া (২৫), রাশিদ মিয়ার ছেলে আতাউর রহমান (২৮), টুনু মিয়ার ছেলে আব্দুল কাইয়ুম (২৬) এবং জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের সাচনা কালীবাড়ি গ্রামের ফুল মিয়ার ছেলে আবুল কালাম ও জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের নয়াহালট গ্রামের সামছু মিয়ার ছেলে আবুল হামজা (২৫)।

ফেনারবাঁক ইউনিয়নের নাজিমনগর গ্রামের প্রতিবেশী দ্বীন ইসলাম বলেন, ‘জনপ্রতি ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে এ পর্যন্ত তিনজনকে ছেড়ে দিয়েছে দালাল চক্র। বাকিদের ছাড়াতে দালালদের সঙ্গে রফাদফা হওয়ায় এখন জিম্মিদের নির্যাতন করা হচ্ছে না। শুনেছি জিম্মি হওয়াদের ছাড়াতে টাকা নিয়ে ভৈরব গেছেন স্বজনেরা। তবে দালালের সুনির্দিষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়নি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক জানিয়েছেন, লিবিয়ার বন্দিদশা থেকে ভিডিও কলে মারধর ও নির্যাতনের দৃশ্য দেখিয়ে দালাল চক্র মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করেছে তাদের কাছে। দালালদের খপ্পরে পড়া এসব যুবক এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে। এ ছাড়া মোটা অঙ্কের টাকায় ইউরোপ যাওয়ার পথে নির্যাতনের শিকার হয়ে সর্বস্বান্ত অবস্থায় বাড়ি ফিরেছেন অনেকে।

ভূমধ্যসাগরে নিহতদের স্বজন, প্রতিবেশী ও প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে নৌযানে থাকা অবস্থায় ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারিয়েছেন দিরাই উপজেলার ছয়জন। এর মধ্যে রয়েছেন কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের আবু সরদারের ছেলে মো. নূরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), আব্দুল গনির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮), মৃত কারি ইসলাম উদ্দিনের ছেলে মো. সাহান এহিয়া (৩৫) ও একই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের আব্দুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮), করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়ানপুর গ্রামের তায়েক মিয়া ও বাসুরি গ্রামের সোহাস মিয়া।

জগন্নাথপুর উপজেলার নিহত পাঁচজনের মধ্যে রয়েছেন চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের চিলাউড়া গ্রামের দুলন মিয়ার ছেলে নাঈম মিয়া (২৪), একই গ্রামের শামছুল হকের ছেলে ইজাজুল হক (২৩), রানীগঞ্জ ইউনিয়নের টিয়ারগাঁও গ্রামের আখলুছ মিয়ার ছেলে শায়েক আহমদ (২৫), ইছাগাঁও গ্রামের বশির মিয়ার ছেলে আলী আহমদ (২২) ও পাইলগাঁও গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে আমিনুর রহমান (২৬)। এ ছাড়া দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিম (২০) ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারিয়েছেন।

জগন্নাথপুরের টিয়ারগাঁও গ্রামের নিহত শায়েক আহমদ লিবিয়ায় ‘গেম ঘরে’ (নৌযানে উঠানোর আগে যেখানে রাখা হয়) থাকা অবস্থায় এক নিকটাত্মীয়ের ফেসবুক মেসেজে বাঁচার আকুতি জানান। তাঁর মেসেজ ছিল, ‘মামা আমি শায়েক। কিতা করলায়। আজিজে কিতা করল। গেইম আর হইত নায়। যদি আমারে জিন্দা তোমরা দেখতায় চাও আমারে ইন (লিবিয়ার গেম ঘর) থাকি নেওয়ায়।’

তারাপাশা গ্রামের নিহত নূরুজ্জামান সরদারের মামা উমেদ আলী ও ভাই হেলাল সরদার জানিয়েছেন, জসীম দালালের আত্মীয় হবিগঞ্জের আশফাকের মাধ্যমে ২২ জানুয়ারি বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে লিবিয়া যায় নূরুজ্জামান, সাজিদুর ও সাহান। তারা গেম ঘরে প্রায় ২০ দিন ছিল। বোটে (নৌযান) ওঠার আগে সুনির্দিষ্ট কোনো অবস্থান জানানো হয়নি তাদের। নৌযানে ওঠার আগে ও পরে কোনো খাবারও দেওয়া হয়নি। মূলত খাবার সংকটে তাদের মৃত্যু হয়েছে।

উমেদ আলী জানিয়েছেন, তারাপাশা গ্রামের সাজিদুর ও সাহান চুক্তি করে একই গ্রামের ওয়াকিব উল্লার ছেলে মুজিব মিয়ার সঙ্গে। লিবিয়ায় অবস্থানরত দোয়ারাবাজারের দালাল জসীমের হয়ে কাজ করেছে মুজিব ও আশফাক। ১২ লাখ টাকায় চুক্তি হয়েছে একেকজনের। মুজিব ও আশফাকের মাধ্যমে টাকার লেনদেন হয়েছে। এখন মৃতদেহ ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন তাঁরা।

জগন্নাথপুরের পাইলগাঁও ইউনিয়নের পাইলগাঁও গ্রামের নিহত আমিনুর রহমানের বড় ভাই মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমার ভাই পরিবারের অজান্তে গ্রিস যেতে চেয়েছিল। স্থানীয় দালাল শাহীন, আজিজ ও জসীমের মাধ্যমে ১২ টাকায় চুক্তি করেছে সে। প্রথমে ৭ লাখ টাকা দিয়েছে। পরে লিবিয়ায় গেম ঘরে থাকা অবস্থায় বাকি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে দালালদের।’

দালালদের বিচার চেয়ে মিজানুর বলেন, ‘গ্রিসগামী এলাকার অন্যদের মাধ্যমে জেনেছি, গেম ঘরে অনাহারে থাকা অবস্থায়ই মিজানুর রহমানসহ অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় তাদেরকে জোর করে বোটে তোলা হয়। অনাহারে আমার ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে। দালালেরা আমাদের সর্বস্বান্ত করে দিল। আমরা তাদের বিচার চাই।’

জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বরকত উল্লাহ বলেন, ‘প্রতিটি পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দালালদের তথ্য নিয়েছি। প্রতিবেদন তৈরি করে পুলিশকে বলে দেওয়া হয়েছে মামলা করার জন্য। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে এ বিষয়ে মামলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

ইউএনও বলেন, ‘পরিবারের কাছ থেকে জানতে পেরেছি মৃতদেহগুলো ভূমধ্যসাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রে লাশ যদি অক্ষত অবস্থায় কোথাও পাওয়া যায় তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমরা জানতে পারব। মন্ত্রণালয়ই বিষয়টি দেখভালো করবে।’

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার বলেন, ‘ইতিমধ্যে নিহত ১২ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। নিহত পরিবারের মাধ্যমে আমরা কয়েকজন দালালের নাম জানতে পেরেছি। আমরা আইনগত প্রক্রিয়ার দিকে এগোচ্ছি। তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত