Ajker Patrika

বগুড়ায় ‘লাল মরিচ বিপ্লব’ ৩০০ কোটির বাণিজ্য

  • জেলায় মরিচ আবাদ ৫,৫৫০ হেক্টর জমিতে
  • উৎপাদিত হয়েছে ১৭,৭৯৯ টন শুকনা মরিচ
  • চার লক্ষাধিক নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে
গনেশ দাস, বগুড়া 
বগুড়ায় ‘লাল মরিচ বিপ্লব’ 
৩০০ কোটির বাণিজ্য
লাল মরিচ শুকানোর কাজে ব্যস্ত কয়েকজন। সম্প্রতি বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার কালীতলা ঘাট যমুনা নদীর তীরে। ছবি: আজকের পত্রিকা

বগুড়ার লাল মরিচের সুনাম দেশজুড়ে। এখানকার মরিচের রং ও গুণগত মান তুলনামূলক ভালো। এ কারণে চাহিদাও বেশি। এবার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম জমিতে মরিচের আবাদ হলেও অনুকূল আবহাওয়া ও ভালো ফলনের কারণে কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। কৃষি বিভাগ বলছে, বাজারদর স্থিতিশীল থাকলে জেলায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার মরিচ বাণিজ্য হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলার রবি ও খরিফ মৌসুম মিলিয়ে মরিচ উৎপাদনের বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। কাঁচা মরিচের বিক্রি যুক্ত হলে এ অঙ্ক ৩০০ কোটি টাকায় পৌঁছাবে।

চলতি মৌসুমে জেলায় মরিচ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ হাজার ৯১৫ হেক্টর জমি। আবাদ হয়েছে ৫ হাজার ৫৫০ হেক্টরে। এসব জমি থেকে উৎপাদিত হয়েছে ১৭ হাজার ৭৯৯ টন শুকনা মরিচ, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ২২২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মরিচ উৎপাদন হয় যমুনা নদীঘেঁষা সারিয়াকান্দি উপজেলায়। প্রতিবছর বন্যার পর চরাঞ্চলে জমে থাকা পলিমাটিকে উর্বর করে তোলে। ফলে তুলনামূলক কম খরচে সেখানে মরিচের ভালো ফলন পাওয়া যায়। উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটিই চরাঞ্চল এবং এসব এলাকার অধিকাংশ জমিতেই মরিচের আবাদ করা হয়।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এ বছর শুধু সারিয়াকান্দিতেই ৩ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ হয়েছে। এ ছাড়া সোনাতলা, গাবতলী, ধুনট ও শেরপুর উপজেলার যমুনা ও বাঙালি নদীর চরাঞ্চলেও ব্যাপকভাবে মরিচ চাষ হচ্ছে। মরিচ চাষ, সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণকে ঘিরে জেলায় ৪ লক্ষাধিক নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।

সারিয়াকান্দির চরবাটিয়া গ্রামের কৃষক আবেদ আলী জানান, এবার তিনি দুই বিঘা জমিতে দেশি উফশী জাতের মরিচ আবাদ করেন। সেখান থেকে প্রায় ১৮ মণ শুকনা মরিচ পেয়েছেন। মণ ৮ হাজার টাকা দরে বিক্রি করেছেন। তিনি বলেন, প্রতি বিঘায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হলেও ফলন ভালো হওয়ায় লাভের সম্ভাবনা রয়েছে।

স্থানীয় পাইকারি ব্যবসায়ী হযরত আলী বলেন, কাঁচা মরিচ স্থানীয় বাজারে বিক্রি হলেও শুকনা মরিচ বড় বড় কোম্পানি পরিবেশকদের মাধ্যমে কিনে নেয়। এরপর সেগুলো বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়।

সারিয়াকান্দির হাট ফুলবাড়ী এলাকার বিভিন্ন চাতালে গিয়ে দেখা যায়, মাঠজুড়ে শুকাতে দেওয়া হয়েছে লাল মরিচ। নারী শ্রমিকেরা মরিচ বাছাই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

শ্রমিক আবেদা বেগম বলেন, স্বামীর আয়ে সংসার ঠিকমতো চলে না। তাই মরিচের মৌসুমে তিনি চাতালে কাজ করতে আসেন। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করে প্রতিদিন ১৮০ টাকা মজুরি পান।

চাতালমালিক ও সারিয়াকান্দি চালকল মালিক সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, তাঁর চাতালে বর্তমানে ৩০ জন শ্রমিক কাজ করছেন, যাদের বেশির ভাগই নারী। গত বছর তিনি ৬০ টন মরিচ কিনলেও এবার প্রায় ২০০ টন কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। শুকানোর পর মরিচ বাছাই করে কোম্পানিগুলোর কাছে সরবরাহ করা হবে। মোজাম্মেল জানান, বর্তমানে বাজারে মানভেদে শুকনা মরিচের দাম প্রতি মণ ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। তবে মৌসুমের শেষ দিকে দাম আরও বাড়তে পারে।

একটি কোম্পানির স্থানীয় পরিবেশক সুমন মিয়া বলেন, তিন মণ কাঁচা লাল টোপা মরিচ শুকিয়ে এক মণ শুকনা মরিচ পাওয়া যায়। বর্তমানে বাজারে শুকনা মরিচের দাম বেশ ভালো।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোহেল মো. শামছুদ্দিন ফিরোজ বলেন, ‘বগুড়ার লাল মরিচের সুনাম দেশজুড়ে রয়েছে। এখানকার মরিচের রং ও গুণগত মান ভালো হওয়ায় চাহিদাও বেশি। এবার আবাদ কিছুটা কম হলেও ফলন প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হয়েছে। বাজারদর স্থিতিশীল থাকলে জেলায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার মরিচ বাণিজ্য হবে বলে আশা তাঁর।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত