Ajker Patrika

শরীয়তপুরে হাজার কোটি টাকায় নির্মাণাধীন তীর রক্ষা প্রকল্পে ভাঙন, বিলীন ২০০ মিটার

শরীয়তপুর প্রতিনিধি
আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১৬: ১৭
শরীয়তপুরে হাজার কোটি টাকায় নির্মাণাধীন তীর রক্ষা প্রকল্পে ভাঙন, বিলীন ২০০ মিটার
শরীয়তপুরের জাজিরায় পদ্মার ভাঙনে ১২০০ কোটি টাকার তীর রক্ষা প্রকল্পের ২০০ মিটার অংশ নদীতে বিলীন। ছবি: আজকের পত্রিকা

শরীয়তপুরের জাজিরায় পদ্মা নদীর ভাঙন রোধে নির্মাণাধীন ১ হাজার ২০২ কোটি টাকার তীর রক্ষা প্রকল্পের কয়েকটি স্থানে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত সাত দিনে প্রকল্পের প্রায় ২০০ মিটার অংশ নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের মুখে ২৫টি পরিবার বসতবাড়ি সরিয়ে নিয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে আরও প্রায় ৩০০ পরিবারের ঘরবাড়ি। এতে নদীপারের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

ভাঙনে পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া, ফরাজীকান্দি এবং নাওডোবা ইউনিয়নের পৈলান মোল্যারকান্দি ও আলম খারকান্দি এলাকায় সাতটি দোকান নদীতে বিলীন হয়েছে। কাথুরিয়া-মাঝিরঘাট সড়কের প্রায় ৫০ মিটার অংশ নদীগর্ভে চলে গেছে। ফলে ওই সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ রয়েছে। বিদ্যুতের তিনটি খুঁটি তারসহ নদীতে পড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ আছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গত সোমবার সকালে নদীর তীরে থাকা জিওব্যাগ তলিয়ে যেতে শুরু করে এবং মাটিতে বড় বড় ফাটল দেখা দেয়। পরে এলাকায় মাইকিং করে সবাইকে সতর্ক করা হয়। এরপর অনেকে ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে নিতে শুরু করেন। কেউ কেউ বসতভিটার গাছপালাও কেটে অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছেন।

কাথুরিয়া এলাকার মুদি দোকানি রেজাউল করিম বলেন, ‘আমার একটি মুদি দোকান ছিল। গত রোববার রাতে মালামালসহ দোকানটি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। পদ্মার ভাঙনে আমি নিঃস্ব হয়ে গেলাম। তিন বছর ধরে বাঁধের কাজ চলছে, কিন্তু ভাঙন থামছে না।’

ভ্যানচালক ইবরাহীম ঘরামী বলেন, ‘সোমবার সকালে কাজে বের হওয়ার সময় দেখি নদীর পাড়ের জিওব্যাগ তলিয়ে যাচ্ছে এবং বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। পরে মাইকিং করে সবাইকে সতর্ক করা হয়। আমি একটি ঘর সরাতে পেরেছি, আরেকটি ঘর নদীতে তলিয়ে গেছে।’

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অভিযোগ করছেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পের কাজ চললেও নদীর ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না। পালেরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল হোসেন ফরাজি বলেন, ‘মানুষের ভিটেমাটি রক্ষায় সরকার প্রায় ১২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে প্রকল্পের কাজ চলছে, জিওব্যাগ ডাম্পিং ও ক্লক স্থাপনের কাজও হচ্ছে। এর মধ্যেই আবার ভাঙন শুরু হয়েছে। প্রকল্পের কাজে ধীরগতি বা কোনো ধরনের অনিয়ম থাকলে তা খতিয়ে দেখা দরকার। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে সঠিকভাবে জিওব্যাগ ডাম্পিং ও ব্লক স্থাপন করা হলে ভাঙন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’

শরীয়তপুরের জাজিরায় পদ্মার ভাঙনে ১২০০ কোটি টাকার তীর রক্ষা প্রকল্পের ২০০ মিটার অংশ নদীতে বিলীন। ছবি: আজকের পত্রিকা
শরীয়তপুরের জাজিরায় পদ্মার ভাঙনে ১২০০ কোটি টাকার তীর রক্ষা প্রকল্পের ২০০ মিটার অংশ নদীতে বিলীন। ছবি: আজকের পত্রিকা

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতু এলাকার নাওডোবা মাঝিরঘাট থেকে ভাটিতে জাজিরা ইউনিয়নের পাথালিয়াকান্দি পর্যন্ত পদ্মার ডান তীরে ১০ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার এলাকায় তীর রক্ষা প্রকল্পের কাজ চলছে। ৩৯টি প্যাকেজে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২০২ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের মার্চে পূর্ব নাওডোবার জিরো পয়েন্ট থেকে পাথালিয়াকান্দি পর্যন্ত ৮ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার অংশে কাজ শুরু হয়। ২০২৫ সালে প্রকল্পের একটি অংশে ভাঙন দেখা দেওয়ার পর মাঝিরঘাট জিরো পয়েন্ট থেকে উজানে আরও দুই কিলোমিটার এলাকা প্রকল্পের আওতায় যুক্ত করা হয়। প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত।

পাউবো জানিয়েছে, প্রকল্পের প্রায় ৫৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি অংশে জিওব্যাগ ফেলার কাজ চলছিল। তবে বর্ষা মৌসুমে পদ্মায় পানি ও স্রোত বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে স্থায়ী কাজের কিছু অংশ বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত কংক্রিটের ব্লক তৈরির কাজ চলছে।

ভাঙনের খবর পেয়ে জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা কাথুরিয়া এলাকা পরিদর্শন করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ৪০টি পরিবারের মধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণসামগ্রী ও নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ভাঙন ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে।

শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান বলেন, ‘প্রকল্পের ১২ নম্বর প্যাকেজ এলাকায় হঠাৎ ভাঙন শুরু হয়। খবর পাওয়ার পরপরই সেখানে জিওব্যাগ ডাম্পিং শুরু করা হয়েছে। এতে আপাতত ভাঙন বন্ধ রয়েছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর এই দুই মাস ভাঙনের ঝুঁকি বেশি থাকে। আমরা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছি। যেখানে ভাঙন দেখা দিচ্ছে, সেখানেই দ্রুত জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে। শুকনো মৌসুমে প্রকল্পের স্থায়ী কাজ শেষ হলে আশা করছি এলাকাটি ভাঙনমুক্ত হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত