Ajker Patrika

দফায় দফায় ১৭ লাখ টাকা আদায় দালাল চক্রের, তবু খোঁজ নেই সন্তানের

শরীয়তপুর প্রতিনিধি
দফায় দফায় ১৭ লাখ টাকা আদায় দালাল চক্রের, তবু খোঁজ নেই সন্তানের
দালালের মাধ্যমে বিদেশে গিয়ে নিখোঁজ যুবক। সন্ধান চেয়ে এলাকাবাসীর মানববন্ধন। ছবি: আজকের পত্রিকা

শরীয়তপুরের ডামুড্যায় সৌদি আরব হয়ে ইতালি পাঠানোর কথা বলে নজরুল ইসলাম রনির পরিবারের কাছ থেকে ১৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে দালাল চক্র। সৌদি আরবে পাঠানোর পর প্রায় দুই বছর হয়ে গেলেও এখনো রনির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি পরিবার। এ অবস্থায় প্রাণপ্রিয় সন্তানের সন্ধান ও অভিযুক্তদের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন পরিবার ও এলাকাবাসী।

আজ বুধবার দুপুর ১২টার দিকে ডামুড্যা উপজেলার উত্তর ডামুড্যা এলাকায় অভিযুক্ত দালাল শাহীন বাবুর বাড়ির সামনের সড়কে মানববন্ধনটি হয়।

ব্যানার-ফেস্টুন হাতে স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারী, পুরুষ ও যুবক মানববন্ধনে অংশ নেন। তাঁরা রনির সন্ধান এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে স্লোগান দেন।

মানববন্ধনে রনির মা রোকসানা বেগম ছেলের সন্ধান চেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘দুই বছর ধরে আমার ছেলে রনির কোনো খবর নেই। সে কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে—কিছুই জানি না। ছেলের শোকে আমি পাগল হয়ে গেছি। আমার ছেলেকে খুঁজে পেতে প্রশাসন ও সরকারের সহযোগিতা চাই।’

রনির ভাই সাব্বির পেদা বলেন, ‘১৭ লাখ টাকা দেওয়ার পরও দুই বছর ধরে আমার ভাইয়ের কোনো সন্ধান নেই। আমি আমার ভাইকে ফিরে পেতে চাই। একই সঙ্গে যারা টাকা নিয়েছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ডামুড্যা উপজেলার উত্তর ডামুড্যা এলাকার মজিবুর রহমান বেপারীর ছেলে শাহীন বাবু আদম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। একই এলাকার আব্দুর রব পেদার ছেলে নজরুল ইসলাম রনিকে (২৫) সৌদি আরবে পাঠানোর জন্য শাহীনের সঙ্গে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, পাসপোর্টের সঙ্গে প্রথমে দুই লাখ টাকা এবং পরে আরও ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়।

২০২৩ সালের ৪ ডিসেম্বর রাত ১১টার দিকে সৌদি আরবের উদ্দেশে বাংলাদেশ ছাড়েন রনি। পরিবারের অভিযোগ, সৌদি আরবে যাওয়ার পর তাঁকে প্রতিশ্রুত কাজ না দিয়ে একটি ঘরে আটকে রাখা হয়। পরে একটি রেস্তোরাঁয় কাজ দেওয়া হলেও কয়েক মাস পর সেই চাকরিও চলে যায়।

পরিবারের দাবি, দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করলে রনিকে সৌদি আরব থেকে ইতালি পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ জন্য আট লাখ টাকা চাওয়া হয়। প্রথমে চার লাখ এবং ইতালিতে পৌঁছানোর পর আরও চার লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়।

পরিবারের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর রনিকে ইতালির উদ্দেশে পাঠানো হয়। কয়েক দিন পর শাহীনের ভাই মিঠু বেপারী ফোন করে রনির পরিবারকে জানান, রনি মাফিয়াদের হাতে আটক হয়েছেন এবং তাঁকে ছাড়িয়ে আনতে ১০ লাখ টাকা প্রয়োজন।

পরিবারের একজন সদস্য পরে রনির সঙ্গে ফোনে কথা বললে তিনি তাঁকে বাঁচানোর জন্য আকুতি জানান বলে দাবি করা হয়। ধারদেনা করে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর শাহীনের কাছে আট লাখ টাকা দেওয়া হয়। টাকা নেওয়ার পর রনির বিষয়ে ভালো খবর দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও এরপর থেকে তাঁর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ পরিবারের।

পরিবারের দাবি, রনির সন্ধান ও টাকা ফেরতের বিষয়ে ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট স্থানীয়ভাবে একটি সালিস বৈঠক হয়। সেখানে শাহীন ও তাঁর লোকজন রনির সন্ধান দেওয়ার আশ্বাস দেন। সন্ধান দিতে না পারলে ছয় মাসের মধ্যে টাকা ফেরত দেওয়ার কথাও বলা হয়। তবে পরে টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি এবং রনিরও সন্ধান মেলেনি।

চলতি বছরের ১৭ আগস্ট শাহীনের বাড়িতে আবারও সালিস বৈঠক হয়। সেখানে শাহীন টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন বলে দাবি করেছে ভুক্তভোগী পরিবার।

পরিবারের সদস্যরা জানান, রনির সন্ধান ও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গত ১৯ আগস্ট ডামুড্যা থানায় মামলা করতে গেলে থানা থেকে মানব পাচার ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে ২৩ আগস্ট রনির ভাই মো. সাব্বির পেদা শরীয়তপুরের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন।

অভিযোগে উত্তর ডামুড্যা এলাকার মৃত মজিবর রহমান বেপারীর ছেলে মো. শাহীন বাবু (৩৬), মিঠুন বেপারী (৩৩) ও সাহানা বেগমকে (৫৫) আসামি করা হয়েছে।

ডামুড্যা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘মানববন্ধনের খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে আসি। এখানে শাহীন বাবু নামে একজনের বিরুদ্ধে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে প্রতারণার অভিযোগে এলাকাবাসী মানববন্ধন করছে বলে জানতে পেরেছি। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত