Ajker Patrika

চালু হয়নি জৈব সার প্ল্যান্ট, দুর্গন্ধ-দূষণে বিপর্যস্ত নগর

  • ২০১৬ সালে জৈব সার উৎপাদন প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হয়।
  • তিন দফা চেষ্টা করেও প্রকল্পটি চালু করা সম্ভব হয়নি।
  • ২১টি প্রকোষ্ঠ নিয়ে গড়ে ওঠা প্ল্যান্টটি প্রায় পরিত্যক্ত।
  • দুর্গন্ধে আশপাশে টিকে থাকা দায়: বাসিন্দা
শিপুল ইসলাম, রংপুর 
চালু হয়নি জৈব সার প্ল্যান্ট, দুর্গন্ধ-দূষণে বিপর্যস্ত নগর
রংপুর মহানগরীর নাচনিয়া এলাকায় বর্জ্যের স্তূপ। ছবি: আজকের পত্রিকা

স্বপ্ন ছিল, বর্জ্য হবে সম্পদ। সেই লক্ষ্যেই রংপুরে নির্মাণ করা হয়েছিল জৈব সার উৎপাদন প্ল্যান্ট। কিন্তু প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকার প্রকল্পটি এক দশকেও চালু না হওয়ায় এখন উল্টো বর্জ্যের স্তূপ, দুর্গন্ধ ও পরিবেশদূষণের বোঝা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে নগরবাসীকে।

রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক) সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে নগরীর নাচনিয়া এলাকায় ২০১৬ সালে প্রায় এক একর জমির ওপর জৈব সার উৎপাদন প্ল্যান্টটি নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পটির ব্যয় ছিল প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকা। পরিকল্পনা ছিল, নগরীর পচনশীল বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার উৎপাদন করা হবে। এতে একদিকে বর্জ্যের চাপ কমবে, অন্যদিকে কৃষকেরা সুলভ মূল্যে জৈব সার পাবেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় পচনশীল বর্জ্যের অভাব, বর্জ্য পৃথক্‌করণে ব্যর্থতা, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং পরিকল্পনার ঘাটতিতে প্রকল্পটি আজও চালু হয়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্ল্যান্টে নেই কোনো কর্মচাঞ্চল্য। ২১টি প্রকোষ্ঠ নিয়ে গড়ে ওঠা প্ল্যান্টটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রতিটি প্রকোষ্ঠে প্রায় ১৫ টন পচনশীল বর্জ্য ধারণের ব্যবস্থা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ৩০ থেকে ৩৩ দিন বর্জ্য পচিয়ে পরে তা ছেঁকে জৈব সার তৈরির কথা। ১০ কেজি বর্জ্য থেকে ৩ থেকে ৪ কেজি সার উৎপাদনের সক্ষমতাও রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কোনো সার উৎপাদিত হচ্ছে না। শুধু সীমিত আকারে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কিছু কার্যক্রম চালু রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্ল্যান্টটি চালুর জন্য প্রথমে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, পরে ২০২১ সালের শেষ দিকে ছিন্নমূল মহিলা সমিতির সঙ্গে নতুন চুক্তি করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় পচনশীল বর্জ্য সরবরাহ করতে না পারায় সেই উদ্যোগও ভেস্তে যায়। এরপর ২০২৪ সালে ‘রি-গ্রিন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান মৌখিক অনুমতি নিয়ে সার উৎপাদনের উদ্যোগ নিলেও সেটি আর বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। তিন দফা চেষ্টা করেও প্রকল্পটি চালু করা সম্ভব হয়নি।

সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ জানায়, জৈব সার উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন অন্তত ২০ টন পচনশীল বর্জ্য প্রয়োজন। অথচ নগরী থেকে ২ থেকে ৩ টন পচনশীল বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। রংপুর মহানগরীতে প্রতিদিন প্রায় ১০০ টন বর্জ্য তৈরি হলেও এর মধ্যে ৬০ থেকে ৬৫ টন সংগ্রহ করা হয়। এসব বর্জ্য মিশ্র অবস্থায় থাকায় সেখান থেকে পচনশীল অংশ আলাদা করে প্ল্যান্টে সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

জৈব সার উৎপাদন বন্ধ থাকায় রসিকের ৩৩টি ওয়ার্ডের বর্জ্য এখন ফেলা হচ্ছে কলাবাড়ী-রথবাড়ী এলাকার ডাম্পিং স্টেশনে। ২০১৯ সালে এই ডাম্পিং স্টেশন তৈরি হলেও সেখানে আধুনিক বা পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলার কারণে সেখানে ময়লার স্তূপ জমে ছোটখাটো পাহাড়ের মতো আকার নিয়েছে। সবুজ লতাপাতায় ঢাকা থাকায় দূর থেকে সেটি পাহাড়ের মতো মনে হলেও কাছে গেলেই তীব্র দুর্গন্ধে টেকা দায়।

রথবাড়ী এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হক বলেন, ‘বৃষ্টি হলে বিষাক্ত পানি আশপাশের জমিতে চলে যায়। অনেক সময় শিয়াল-কুকুর ও কাক বর্জ্যের স্তূপ থেকে হাড়গোড় টেনে অন্যত্র ছড়িয়ে দেয়। এতে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।’

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পরিবেশ সুরক্ষা ফোরাম রংপুরের আহ্বায়ক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘দ্রুত জৈব সার প্ল্যান্ট চালু এবং আধুনিক ডাম্পিং ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে রংপুরের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য বড় ঝুঁকিতে পড়বে।’

রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিব হাসান বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জৈব সার উৎপাদনের জন্য সরকারি দুটি কনসালটেশন ফার্মের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। পাশাপাশি কলাবাড়ী ডাম্পিং স্টেশন নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত