Ajker Patrika

রংপুরে লোডশেডিংয়ে নাজেহাল জনজীবন

শিপুল ইসলাম, রংপুর 
রংপুরে লোডশেডিংয়ে নাজেহাল জনজীবন
বিদ্যুৎ না থাকায় রংপুরে একটি প্রেসে অলস সময় কাটাচ্ছেন কর্মীরা। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে প্রেসের কাজ বেশির ভাগ সময় বন্ধ থাকছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

প্রচণ্ড গরম। তার ওপর দিনে-রাতে পাল্লা দিয়ে চলছে বিদ্যুতের আসা-যাওয়া। আধা ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে এক ঘণ্টা নেই। রংপুরে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে এখন নাজেহাল জনজীবন। ঘুম, রান্না, ব্যবসা-বাণিজ্য, কারখানা—সবকিছুতেই নেমে এসেছে স্থবিরতা। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে শিশু ও বৃদ্ধরা। বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা এবং ছোট কারখানার উৎপাদন কমে যাওয়ায় আয়-রোজগারেও পড়েছে টান।

শহরের পাশাপাশি গ্রামের চিত্রও একই। কোথাও গরমে খামারের গবাদি পশুপাখি নিয়ে দুশ্চিন্তায় খামারি, কোথাও বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ ও উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যাঘাত। সব মিলিয়ে লোডশেডিংয়ে রংপুরের গ্রাম-নগরে মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।

নগরীর জুম্মাপাড়ার বাসিন্দা শারমিন আক্তার বলেন, ‘বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। সকালে সময়মতো রান্না করতে পারছি না। ছেলে স্কুলে যাচ্ছে না খেয়ে। স্বামীও না খেয়েই কাজে চলে যাচ্ছে।’

আরেক গৃহিণী কহিনুর বেগম বলেন, ‘এই গরমে বৃদ্ধ শাশুড়িকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছি। বিদ্যুৎ থাকছে না। তাই সব সময় হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে হচ্ছে। এই লোডশেডিং আমাদের অনেক ভোগাচ্ছে।’

আর কে রোডের মুদ্রণ ব্যবসায়ী শাহ বায়েজিদ আহমেদ বলেন, ‘আমার ব্যবসা বিদ্যুৎনির্ভর। দিনের বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। আয়-রোজগার একেবারে কমে গেছে। কর্মচারীদের বেতন, দোকান ভাড়া কীভাবে দেব—কিছুই বুঝতে পারছি না।’

চাকরিজীবী আব্দুর রশিদ জীবন বলেন, ‘সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে যেতে হয়। কিন্তু রাতে লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। সকালে কাজে গিয়ে শরীর-মন কোনোটাই ঠিক থাকে না। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান দরকার।’

গ্রামের খামারিদেরও একই ধরনের দুর্ভোগ। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়ছেন তাঁরা। বৈদ্যুতিক ফ্যান ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থা সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তারাগঞ্জের ইকরচালী গ্রামে খামারি হৃদয় ৷ হোসেন বলেন, ‘গরমে মানুষই টিকতে পারছে না, মুরগিগুলোর অবস্থা আরও খারাপ। বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্যান চলে না, পানি তোলা যায় না। খামার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।’

শুধু বাসাবাড়ি কিংবা ব্যবসা নয়; বিদ্যুতের সংকটে রংপুরের ছোট ছোট কারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎনির্ভর যন্ত্রপাতি বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের অলস বসে থাকতে হচ্ছে। এতে মালিকদের উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের আয়েও প্রভাব পড়ছে।

হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা দিয়ে জরুরি সেবা সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে চিকিৎসক, নার্স ও রোগীর স্বজনদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের মহানগর সভাপতি মো. জোবাইদুল ইসলাম বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে রংপুরের প্রতিটি স্তরের মানুষ নাজেহাল। শিশু, বৃদ্ধ, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী—কেউ এর বাইরে নয়। দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

নেসকো রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, ‘লোডশেডিং শুধু রংপুরে নয়, সারা দেশে এ সমস্যা চলছে। চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন কম হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে দ্রুত লোডশেডিং সমস্যা সমাধানে আমরা কাজ করছি।’

রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার মোনোয়ারুল ইসলাম ফিরোজী বলেন, ‘আমাদের ৭৭টি ফিডারে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১১০ মেগাওয়াট। বর্তমানে ৭৫ থেকে ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। সারা দেশে যে পরিস্থিতি, আমাদের এখানেও একই অবস্থা।’

রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার মুহাম্মদ আশরাফ উদ্দিন খান বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের এলাকায় ৯৮টি ফিডার রয়েছে। সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১২৯ মেগাওয়াট। কিন্তু দিনের বিভিন্ন সময়ে ৭০ থেকে ৮২ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহে বড় ঘাটতি থাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘১০ থেকে ১২ দিন আগেও এলাকায় গড়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশ লোডশেডিং হতো। বর্তমানে তা বেড়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।’ লোডশেডিংয়ের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘জাতীয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির সংকটই এর প্রধান কারণ। মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে অভ্যন্তরীণ ত্রুটিজনিত আগুনের পর সেটি বন্ধ রয়েছে। ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত গরমে বিদ্যুতের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে চাপ তৈরি হয়েছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত