Ajker Patrika

দেড় শ বছর ধরে টিকে আছে আটঘরের ডিঙি নৌকার হাট

মো. হাবিবুল্লাহ , নেছারাবাদ (পিরোজপুর)
দেড় শ বছর ধরে টিকে আছে আটঘরের ডিঙি নৌকার হাট
খালের পাড়ে বেঁধে রাখা হয়েছে সারি সারি ডিঙি নৌকা। ছবি: আজকের পত্রিকা

সারি সারি ডিঙি নৌকা বেঁধে রাখা হয়েছে খালের পাড়ে। খাল বেয়ে নৌকা নিয়ে হাটে আসছেন বিক্রেতারা। বড় নৌকা কিংবা ট্রলারে করেও হাটে আনা হচ্ছে আবহমান বাংলার অতি পরিচিত এ জলযান। ঢেউয়ের তালে তালে চলছে কেনাবেচা।

এই চিত্র পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর খাল এলাকার। বর্ষা মৌসুমে খাল এলাকাজুড়ে ভাসমান হাট জমজমাট হয়ে ওঠে। এ খালে সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার বসে ডিঙি নৌকার হাট। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে নৌকা বেচাকেনা। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকেও নৌকা কিনতে আসেন ক্রেতারা।

নৌকা ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, নদী-খালবেষ্টিত এই অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনের বাহন হিসেবে নৌকা এখনো জনপ্রিয়। প্রতি হাটেই আটঘর খাল এলাকায় ডিঙি থেকে শুরু করে বিভিন্ন আকারের শত শত নৌকা ওঠে। বর্তমানে নৌকা তৈরিতে কাঠ ও কারিগরের মজুরিসহ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বেচাকেনায় ভাটা পড়েছে। কোনো রকমে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।

খালের পাশে সড়কে নৌকার দরদাম করছেন ক্রেতারা। ছবি: আজকের পত্রিকা
খালের পাশে সড়কে নৌকার দরদাম করছেন ক্রেতারা। ছবি: আজকের পত্রিকা

আজ শুক্রবার উপজেলার বলদিয়া এলাকা থেকে হাটে ৩৫টি নৌকা নিয়ে এসেছেন কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘প্রায় ৩০ বছর ধরে এই হাটে নৌকা বিক্রি করি। বর্ষার সময়ে হাটে ক্রেতা বেশি থাকে। কিন্তু এবার বিক্রি কম হচ্ছে। ৩৫টি নৌকার মধ্যে মাত্র একটি বিক্রি করেছি। ৯ হাতের একটি নৌকা তিন হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা বিক্রি হয়।’

ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম বলেন, একটি ভালো মানের ৯ হাত নৌকা তৈরিতে একজন কারিগরের প্রায় দুই দিন সময় লাগে। দৈনিক ৮০০ টাকা মজুরি হিসেবে শ্রমিক খরচ পড়ে ১ হাজার ৬০০ টাকা। কাঠের খরচ লাগে প্রায় দুই হাজার টাকা। কিন্তু বিক্রি করা যায় চার হাজারের মতো। এখন নৌকার ব্যবসা ভালো হচ্ছে না। হাটের অবস্থাও ভালো নয়।

হাটে নৌকা কিনতে আসা উপজেলার বিনয়কাঠি গ্রামের আজিজ হাওলাদার বলেন, ‘মাছ মারার জন্য ডিঙি নৌকা কিনতে এসেছি। গত বছরের তুলনায় নৌকার দাম একটু কম মনে হচ্ছে। দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকার মধ্যে একটি নৌকা কিনব।’

ট্রলারে করে ডিঙি নৌকা নিয়ে এসেছেন ব্যবসায়ীরা। ছবি: আজকের পত্রিকা
ট্রলারে করে ডিঙি নৌকা নিয়ে এসেছেন ব্যবসায়ীরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

হাটে ঘুরতে আসা দুই গৃহিণী ফাতেমা ও সুরাইয়া বলেন, ‘অনেক দূর থেকে নৌকার হাটে ঘুরতে এসেছি। অনেক দিনের শখ ছিল। হাট দেখে খুবই ভালো লাগছে।’

হাটের ইজারা আদায়ের দায়িত্বে থাকা মো. ইকবাল জানান, নৌকাপ্রতি ১০০ টাকায় ১২ টাকা হারে খাজনা নেওয়া হচ্ছে। তবে অনেকের কাছ থেকে এরচেয়েও কম নেওয়া হচ্ছে। এ বছর বেচাকেনা কম। এক হাটে ১০০-১৫০টি নৌকা বিক্রি হয়।

ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রতি হাটে অন্তত ২০০টি নৌকা বিক্রি হয়, যার আনুমানিক মূল্য ১০ লাখ টাকা। প্রতিবছর কয়েক লাখ টাকায় হাটটি ইজারা দেওয়া হলেও হাটের পরিবেশ ব্যবসাবান্ধব হয়ে ওঠেনি। ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রামাগার ও শৌচাগার নেই। দূরদূরান্ত থেকে ক্রেতা-বিক্রেতারা হাটে এসে নানান ভোগান্তিতে পড়েন।

পুরোনো ব্যবসায়ীদের মতে, দেড় শ বছর আগে গোড়াপত্তন হওয়া আটঘর হাটে প্রতি বর্ষায় মানুষের আনাগোনা বাড়ে। নৌকার সারি, খালের ঢেউ আর ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে প্রতি শুক্রবার পুরোনো চিত্র ফুটে ওঠে। এ হাট শুধু বেচাকেনার জায়গা নয়, দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ জীবন, জীবিকা ও নৌ সংস্কৃতির এক জীবন্ত ঐতিহ্য। নৌকার ব্যবহার কমলেও মানুষের প্রয়োজন আর ঐতিহ্যের টানে এখনো টিকে আছে আটঘরের হাট।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত