Ajker Patrika

পাবনা পৌরসভা: দখলে হারাচ্ছে জলাধার

  • দখল ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবকেই দুষছেন সবাই
  • সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোয় নেই জলাধারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা কিংবা সংরক্ষণের সমন্বিত পরিকল্পনা
  • জলাধার ভরাটে সুপেয় পানির সংকট, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ছে, বলছেন বিশেষজ্ঞরা
­­শাহীন রহমান, পাবনা
পাবনা পৌরসভা: দখলে হারাচ্ছে জলাধার
ভরাট ও বিভিন্ন স্থানে দখল হয়েছে জামতলা জলাধার। পাবনা ডিসি অফিসের পেছনের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের মাধ্যমে সেটি আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি শহরের জেলাপাড়া এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

পাবনা শহরে রয়েছে অসংখ্য পুকুর, দিঘি ও প্রাকৃতিক জলাধার। একসময় এসব জলাধার ছিল সুপেয় পানির প্রধান উৎস, ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য রক্ষার কার্যকর মাধ্যম এবং নগরীর সৌন্দর্যের অনন্য নিদর্শন। কিন্তু দখল, দূষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব জলাধার হারিয়ে যাওয়ার পথে।

শহরের অধিকাংশ জলাধারই বেহাল। ডিসি অফিসের পেছনে বাচ্চু স্মৃতি সড়কের পাশে প্রায় দুই শতাব্দী পুরোনো জামতলা জলাধার (নীলকরদের পরিখা) আংশিক ভরাট ও দখলের শিকার হয়েছে। অবশিষ্ট অংশও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের মাধ্যমে সংকুচিত করা হচ্ছে।

দিলালপুর চারতলা মোড় এলাকার হিমসাগর পুকুরে প্রতিদিন পয়োবর্জ্য ও আবর্জনা পড়ছে। কালাচাঁদ পাড়ার তালতলা পুকুরে আবাসিক এলাকার ড্রেনেজ লাইন সংযুক্ত থাকায় পানি থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। শালগাড়িয়া এলাকার ঝাঁজরা পুকুর কচুরিপানায় আচ্ছাদিত হয়ে মশার প্রজননস্থলে পরিণত হয়েছে। রাধানগর এলাকার মজুমদার পুকুর প্রায় ভরাটের পথে। আর জেলাপাড়া পুকুর দীর্ঘদিনের অবহেলায় হারিয়েছে তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য। যুগীপাড়া মোড়ে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক-সংলগ্ন পুকুরটিও ভরাটের পথে।

পাবনা পৌরসভার বাসিন্দা ও শিক্ষক পাভেল মৃধা বলেন, ‘এসব জলাধার ভরাট হয়ে যাওয়ায় শহরে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে পানির সংকট আরও বাড়বে। এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভোগান্তিতে পড়বে।’

তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাছে নেই এসব জলাধারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা কিংবা সংরক্ষণের সমন্বিত পরিকল্পনা। পাবনা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. দুলাল উদ্দিন জানান, পৌরসভায় মোট কতটি জলাধার রয়েছে, সেই তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের কাছে নেই। বিস্তারিত তথ্য উপসহকারী প্রকৌশলীর কাছে রয়েছে। পরে একাধিকবার চেষ্টা করেও উপসহকারী প্রকৌশলীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পাবনা পৌর প্রশাসকের কাছেও জলাধারের সংখ্যা সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে পৌর প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি কিছু বলতে পারছি না। তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করলে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।’ জলাধারসমূহের ভরাট-দখল ও দূষণ রোধে পৌরসভার ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে চাননি।

পাবনা জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. ইউসুফ আলী জানান, জলাধারের নির্দিষ্ট তালিকা তাঁদের কাছেও নেই। অভিযোগ পেলে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যৌথভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তামারা তাসবিহা বলেন, উপজেলা পরিষদ চত্বরে দুটি পুকুর থাকলেও সদর উপজেলা প্রশাসনের মালিকানাধীন বা সদর উপজেলার সব খাস জলাধারের তথ্য ইউএনও কার্যালয়ে নেই। বিস্তারিত জানতে সদর উপজেলা ভূমি অফিসে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।

সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম ফুয়াদ বলেন, উপজেলায় সায়রাতভুক্ত জলমহাল রয়েছে ৩০টি, এগুলোর মধ্যে ২০ একরের বেশি আয়তনের ১৯টি। তবে অন্য জলাধারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা ভূমি অফিসেও সংরক্ষিত নেই।

একইভাবে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলীও পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীন জলাধারের সংখ্যা জানাতে পারেননি।

এ বিষয়ে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীব ও ভূবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘নগর পরিবেশ ও ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য রক্ষায় পুকুর, দিঘি ও প্রাকৃতিক জলাধারের ভূমিকা অপরিসীম। জলাধার ভরাট ও দূষণের কারণে সুপেয় পানির সংকট, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) পাবনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হামিদ খান বলেন, ‘অবিলম্বে পাবনা শহরের সব জলাধারের ডিজিটাল তালিকা প্রস্তুত, দখল ও দূষণমুক্ত করতে কঠোর অভিযান, নিয়মিত সংস্কার এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে শহরের শতবর্ষী জলাধারগুলো শুধু ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত