Ajker Patrika

মা-বাবা হারানো তাসফিয়ার জিপিএ-৫

­হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি
আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১৭: ৩৭
মা-বাবা হারানো তাসফিয়ার জিপিএ-৫
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে তাসফিয়া। ছবি: আজকের পত্রিকা

তাসফিয়ার বয়স যখন আট বছর, তখন তাঁর বাবা ক্যানসারে আক্রান্ত হন। এরপর মা তাঁদের ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। কয়েক বছরের মধ্যে বাবা মারা গেলে অসহায় মেয়েটি অকূলপাথারে পড়ে। এ সময় কৃষক চাচা মোহাম্মদ ইলিয়াস তাঁর দায়িত্ব নেন। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই তাসফিয়ার লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে যান মাথার ওপর ছায়া হয়ে।

সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও পড়াশোনার প্রতি তাসফিয়ার আগ্রহ ও মনোযোগে ভাটা পড়েনি কখনো। প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণসহ দৈনন্দিন জীবনের নানা সংকটের মধ্যেও নিয়মিত পড়াশোনা, শিক্ষকদের পরামর্শ এবং নিজের কঠোর পরিশ্রমে এগিয়ে গেছে সে। আর তারই ফলে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার রেহানিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের এই ছাত্রী। বিদ্যালয়টির ৩১ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করল।

ফল প্রকাশের পর জিপিএ-৫ পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে আনন্দিত হন তাসফিয়ার পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী ও এলাকাবাসী। রেহানিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা মনে করছেন, তাসফিয়ার এই সাফল্য বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষার্থীদেরও পড়াশোনায় উৎসাহিত করবে।

তাসফিয়ার সাফল্যের খবর উপজেলা প্রশাসনের কাছেও পৌঁছেছে। তাকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে আহ্বান করা হয়। তার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে নগদ অর্থ সহায়তার পাশাপাশি কলেজে ভর্তি, প্রাইভেট পড়ানো, যাতায়াত, পোশাক, বই-খাতা ও কলমসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল বলেন, ‘রেহানিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের ৩১ বছরের ইতিহাসে প্রথম জিপিএ-৫ অর্জন করেছে তাসফিয়া। তার এই সাফল্য সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। এটি তার মেধা, পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রমাণ। তার স্বপ্নপূরণে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। বৃত্তি প্রদানসহ সরকারের সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। তাসফিয়া যেন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন তার পাশে থাকবে।’

তাসফিয়ার চাচা মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, ‘তাসফিয়া ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্ট করেছে। তার মা-বাবা না থাকার কষ্ট তো আমি দূর করতে পারব না, কিন্তু কৃষিকাজ করে নিজের শত অভাবের মধ্যেও তাকে নিজের মেয়ের মতো করেই রেখেছি। সে জিপিএ-৫ পাওয়ায় আমরা খুবই আনন্দিত। তার এই সাফল্যে আমাদের কষ্ট সার্থক হয়েছে। আমি চাই, সে পড়াশোনা চালিয়ে যাক এবং নিজের স্বপ্ন পূরণ করুক।’

রেহানিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জগদীশ চন্দ্র দাস বলেন, ‘তাসফিয়া অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সে কখনো পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে যায়নি। তার জিপিএ-৫ অর্জন আমাদের বিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। বিদ্যালয়ের ৩১ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাসফিয়ার এই অর্জন আমাদের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি দিদারুল ইসলাম সবুজ বলেন, ‘তাসফিয়ার সাফল্যে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। মা-বাবা না থাকার পরও চাচার কাছে থেকে সে যে কঠোর পরিশ্রম করে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার মতো শিক্ষার্থীদের পাশে সমাজের বিত্তবান ও সচেতন মানুষদের দাঁড়ানো উচিত।’

ভবিষ্যতে শিক্ষক হতে চায় তাসফিয়া। সে বলে, ‘চাচা আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন এবং পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছেন। শিক্ষকেরাও সব সময় উৎসাহ দিয়েছেন। জিপিএ-৫ পেয়ে আমি খুব আনন্দিত। ভবিষ্যতে আমি শিক্ষক হতে চাই। আমার মতো যারা কষ্টের মধ্যে আছে, তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই এবং পড়াশোনায় সহযোগিতা করতে চাই।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত