Ajker Patrika

ভরা মৌসুমেও পদ্মা-যমুনায় ইলিশ নেই, পেশা বদলের চিন্তায় জেলেরা

আব্দুর রাজ্জাক, (ঘিওর) মানিকগঞ্জ
আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭: ৪৬
ভরা মৌসুমেও পদ্মা-যমুনায় ইলিশ নেই, পেশা বদলের চিন্তায় জেলেরা
জেলেদের জালে উঠছে না প্রত্যাশিত ইলিশ। ছবি: আজকের পত্রিকা

ভরা মৌসুমেও মানিকগঞ্জের পদ্মা-যমুনায় জেলেদের জালে উঠছে না প্রত্যাশিত ইলিশ। ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা জাল ফেলে মিলছে দু-একটি মাছ, কখনো ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। আয় কমে যাওয়ায় দাদনের টাকা পরিশোধ ও সংসার চালাতে চাপ বাড়ছে জেলেদের। আর সরবরাহ কম থাকায় বাজারে বেড়েছে ইলিশের দাম।

আজ শুক্রবার ভোরে শিবালয়ের আরিচা ঘাটের মাছের আড়তে গিয়ে দেখা যায়, একের পর এক মাছ ধরার নৌকা ঘাটে ফিরলেও অধিকাংশ নৌকায় ইলিশ নেই। কোনো নৌকায় দু-একটি মাছ উঠছে, কোনো নৌকা ফিরছে অন্য মাছ নিয়ে। ফলে আড়তগুলোতে ইলিশের সরবরাহ একেবারেই কম।

শিবালয়ের জাফরগঞ্জ ও হরিরামপুরের বাজারেও ইলিশ দেখা যাচ্ছে না তেমন। সরবরাহ কম থাকায় দাম সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে গেছে।

আরিচা ঘাটের আড়তদারদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এক কেজি ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার তা ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। কিছুদিন আগে একই আকারের ইলিশ ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। জেলেদের কাছ থেকে বেশি দামে মাছ কেনা এবং পরিবহনসহ অন্যান্য খরচের কারণে বাজারে দাম বাড়ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

বানিয়াজুরীর স্কুলশিক্ষক রুহুল আমিন বলেন, ‘ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। তারপরও চাহিদামতো মাছ মিলছে না। ভরা মৌসুমেও এমন অবস্থা আগে খুব একটা দেখিনি।’

যমুনাপারের বাচামারা এলাকার জেলে অহেদ আলী বলেন, ‘আমরা ছয়জন মিলে নৌকায় দিন-রাত মাছ ধরি। প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা নদীতে থাকার পর ইলিশ পাই দুই থেকে তিন হাজার টাকার। কিন্তু নৌকা ও জ্বালানিসহ খরচ হয় তার চেয়ে বেশি। গত বছরের তুলনায় এবার নদীতে ইলিশ নেই বললেই চলে।’

হরিরামপুরের বাহিরচর গ্রামের জেলে ফারুক ব্যাপারী বলেন, ‘শুধু মাছ ধরে এখন আর সংসার চালানো সম্ভব নয়। তাই মাছ ধরার পাশাপাশি কৃষিকাজ করতে হচ্ছে। নদী আগের মতো গভীর নেই, মাছও তেমন আসে না।’

শিবালয়ের অন্বয়পুরের যমুনাপারের জেলে মামুন মৃধা বলেন, মাছ কমে যাওয়ায় নদীতে আগের মতো আয় হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে মাছ ধরার পেশা ছেড়ে অন্য কাজ করতে হবে।

ইলিশের সংকটের প্রভাব পড়েছে আড়তদারদের ওপরও। আরিচা ঘাটের অন্যতম আড়তদার হাজি মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘ইলিশ গভীর পানির মাছ। পদ্মা-যমুনায় নাব্যতা কমে যাওয়ায় ইলিশের বিচরণও কমছে। সরবরাহ না থাকায় অনেক আড়তদার সমস্যায় পড়েছেন। কেউ আড়ত বন্ধ করেছেন, কেউ বন্ধ করার পথে।’

বেসরকারি কৃষি ও মৎস্য গবেষণা সংস্থা বারসিকের মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক সমন্বয়কারী বিমল রায় বলেন, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, পলি জমে চর ও ডুবোচর সৃষ্টি, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অবৈধ কারেন্ট জালে মাছ ধরার কারণে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে।

জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মায় ২০২০-২১ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ১ হাজার ১৫৯ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ১ হাজার ৯০ টনে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬২২ টনে নেমে আসে। চার বছরের ব্যবধানে আহরণ কমেছে প্রায় ৪৬ শতাংশ।

মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ মনিরুল ইসলাম মনির বলেন, ‘গভীর সমুদ্র থেকে ইলিশ ডিম ছাড়ার জন্য নদীতে আসে। কিন্তু নাব্যতা সংকট, ডুবোচর, অপরিকল্পিত ড্রেজিং, দূষণ, খাদ্যসংকট ও অবৈধ জালে মাছ ধরার কারণে ইলিশ কমে যাচ্ছে। তবে এখনো মৌসুমের সময় আছে, ইলিশ নদীতে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।’

জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইলিশ সুরক্ষায় চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ২৬২টি অভিযান ও ৭৫টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৩ টন ইলিশ ও ২ লাখ ২৯ হাজার মিটার অবৈধ জাল জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া ১০৯টি মামলা করা হয়েছে এবং ৭০ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত