Ajker Patrika

মাদারীপুর: শিক্ষকতা ছেড়ে মানব পাচারে ২ বছরে কোটিপতি হাবিবুর

  • ইতালি পাঠানোর প্রলোভনে হাতিয়ে নেওয়া হয় এসব টাকা
  • লিবিয়ায় বন্দী ভুক্তভোগী যুবকদের ওপর চলছে নির্যাতন
  • অস্বাভাবিক লেনদেনে হাবিবুরের ৪ ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ
আয়শা সিদ্দিকা আকাশী, মাদারীপুর
মাদারীপুর: শিক্ষকতা ছেড়ে মানব পাচারে
২ বছরে কোটিপতি হাবিবুর
খন্দকার হাবিবুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

২৫ হাজার টাকা বেতনে শিক্ষকতার চাকরি করতেন মাদারীপুরের কালকিনির খন্দকার হাবিবুর রহমান। কিন্তু জেলার মানুষজনের ইতালি যাওয়ার প্রবণতা দেখে সেই চাকরিতে মন বসাতে পারেননি। দুই বছর আগে জড়িয়ে পড়েন মানব পাচারে। এতে ভাগ্য খুলে যায় হাবিবুরের। মাত্র দুই বছরেই হয়ে যান কোটি কোটি টাকার মালিক।

অভিযোগ উঠেছে, ইতালি পাঠানোর প্রলোভনে বিভিন্ন এলাকার অর্ধশত যুবকের কাছ থেকে এসব টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন হাবিবুর। ওই সব যুবকের অনেকেই এখন লিবিয়ার বন্দিশালায় আটক। সেখানে তাঁদের ওপর অমানবিক নির্যাতন করা হচ্ছে। এদিকে সম্প্রতি অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগে হাবিবুরের চারটি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

হাবিবুর উপজেলার দক্ষিণ গোপালপুরের খন্দকার আলমগীর হোসেনের ছেলে। জানা গেছে, ডাসার উপজেলার গোপালপুরের ধজি হামিদিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন তিনি। ২৫ হাজার টাকা বেতনে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে মাস ছয়েক আগে স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাবিবুর মাদারীপুরসহ বিভিন্ন এলাকার যুবকদের প্রলোভন দেখিয়ে ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দিতেন। ১৮-২০ লাখ টাকার চুক্তিতে অর্ধশত যুবকের কাছ থেকে নিয়েছেন কয়েক কোটি টাকা। পরে তাঁদের ইতালি নেওয়ার নামে লিবিয়ায় বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়। অনেককে লিবিয়ার মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। ১০ মাস ধরে এসব যুবক লিবিয়ায় বন্দী আছেন। তাঁদের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণের লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়। এমনকি এখনো টাকা চাওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি কয়েকবার ভুক্তভোগী যুবকদের পরিবারের সদস্যরা হাবিবুরের বাড়ি ঘেরাও ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, গত দুই বছরে অর্ধশত কোটি টাকা লেনদেন হয় হাবিবুরের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে। এ কারণে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের ৪টি অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পর থেকে এসব ব্যাংকে বন্ধ রয়েছে তাঁর সব লেনদেন। এ ছাড়া হাবিবুরের বিরুদ্ধে ঢাকায় সিআইডি পুলিশ মানব পাচারের আশঙ্কা উল্লেখ করে প্রতিটি ব্যাংকে লেনদেন অনুসন্ধান শুরু করেছে।

ভুক্তভোগীদের একজন ডাসার উপজেলার বনগ্রামের হাবিবুল ঘরামি। তাঁকে ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে ২০ লাখ টাকা নেন হাবিবুর। এরপর এক বছর আগে ইতালি যাওয়ার জন্য বাড়ি ছাড়েন হাবিবুল। কিন্তু তাঁকে ইতালি না পাঠিয়ে লিবিয়া নিয়ে বন্দী করা হয়। পরে নির্যাতন করে পরিবারের কাছ থেকে আরও ৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়।

একই উপজেলার রামনগর গ্রামের নুরু সরদারের ছেলে সিফাত সরদারকেও ইতালি নেওয়ার কথা বলে ২২ লাখ টাকা নেওয়া হয়। এরপর লিবিয়ায় নিয়ে বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়। ১০ মাস ধরে সেখানে বন্দী সিফাত।

একই অবস্থা বরিশালের গৌরনদী উপজেলার খাঞ্জাপুরের হাবিব হাওলাদারের ছেলে সাগর হাওলাদারের। বন্দী আছেন মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার পশ্চিম শিকার মঙ্গল গ্রামের আক্তার বেপারীর ছেলে ফয়সাল হোসেন। দালাল হাবিবুর রহমানের প্রলোভনে পড়ে লিবিয়ায় বন্দী আছেন মাদারীপুরসহ বিভিন্ন এলাকার অর্ধশত যুবক।

ডাসার উপজেলার বনগ্রামের ভুক্তভোগী হাবিবুল ঘরামির নানি রোকেয়া বেগম বলেন, ‘প্রায় এক বছর হলো হাবিবুল ঘরামি লিবিয়াতে বন্দী আছে। তাকে ইতালি নিচ্ছে না, আবার দেশেও আনছে না। লিবিয়ায় বন্দী রেখে আমার নাতিকে অনেক নির্যাতন করা হচ্ছে। অনেকবার দালাল হাবিবের বাড়িতে গিয়েছি। তাকে বাড়িতে পাই না। আমার এখন নিরুপায় হয়ে গেছি। এই ঘটনায় দালাল হাবিবের কঠিন বিচার চাই। আমার নাতিকে সুস্থ অবস্থায় দেখতে চাই।’

কালকিনি উপজেলার পশ্চিম শিকার মঙ্গল গ্রামের ভুক্তভোগী ফয়সাল হোসেনের মা পারুল বেগম বলেন, ‘চুক্তির পরও দালাল হাবিব মাস্টারকে আরও ৭ লাখ টাকা বেশি দিয়েছি। তবুও আমার ছেলে লিবিয়ায় বন্দী আছে।’

ডাসারের ধজি হামিদিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ছয় মাস আগে হাবিবুর মাদ্রাসার শিক্ষকতা থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্রে তিনি ব্যক্তিগত সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। এর আগে তিনি দীর্ঘদিন মাদ্রাসায় অনুপস্থিত ছিলেন। পরে আমরা জানতে পারি, শিক্ষকতার আড়ালে মানব পাচারে জড়িয়ে পড়েছেন।’

কৃষি ব্যাংকের ডাসার উপজেলার গোপালপুর হাট শাখার ম্যানেজার কে এম আতাহার হোসেন বলেন, কৃষি ব্যাংকে হাবিবুরের অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে। এ ছাড়া অন্য কয়েকটি ব্যাংকেও কোটি কোটি টাকা লেনদেন করেছেন তিনি। তাই তাঁর একাধিক ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

অভিযুক্ত হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হওয়ায় একটু সমস্যায় পড়ে গেছি। বিষয়টি নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। লিবিয়ায় আটকা পড়া যুবকদের শিগগির মুক্ত করে ইতালি পাঠানো হবে। আমি কারও টাকা মেরে খাব না; আর কোথায় পালিয়েও যাব না। শিগগির সবকিছুর সমাধান হয়ে যাবে।’

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ সাব্বির হোসেন বলেন, সম্প্রতি হাবিবুর রহমানের বাড়ি ঘেরাওয়ের খবর পেয়ে সেখানে পুলিশ যায়। ভুক্তভোগীদের থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত