Ajker Patrika

ইবি শিক্ষিকাকে খুন: নেপথ্যে কি কর্মচারীর ব্যক্তিগত আক্রোশ

কুষ্টিয়া প্রতিনিধিইবি সংবাদদাতা
আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৬, ২১: ২৩
ইবি শিক্ষিকাকে খুন: নেপথ্যে কি কর্মচারীর ব্যক্তিগত আক্রোশ
বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনের সামনে ভিড় (ইনসেটে নিহত শিক্ষিকা) । ছবি: আজকের পত্রিকা

কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহযোগী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে (৩৮) ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কর্মচারী ফজলুর রহমানও নিজ গলায় ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তাঁকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আজ বুধবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অন্তর্ভুক্ত সমাজকল্যাণ বিভাগের চেয়ারম্যানের দপ্তরে এ চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। সূত্র বলছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, বেতনসংক্রান্ত বিরোধ ও অন্য বিভাগে বদলির ক্ষোভের জেরে কর্মচারী ফজলুর এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।

বিভাগীয় সূত্রে জানা গেছে, ফজলুর সমাজকল্যাণ বিভাগের একজন থোক বরাদ্দপ্রাপ্ত ডে-লেবার ছিলেন। তিনি কয়েক বছর ধরে বিভাগের সুপারিশে ডে-লেবার ভিত্তিতে বেতন পেয়ে আসছিলেন। প্রায় এক মাস আগে বেতন বৃদ্ধি-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বিভাগের সভাপতির সঙ্গে তাঁর বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। পরে তাঁকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। একদিকে বেতন বকেয়া, অন্যদিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করায় সভাপতির ওপরে ক্ষুব্ধ ছিলেন ফজলুর। ধারণা করা হচ্ছে, এ ক্ষোভ থেকেই খুন করেছেন তিনি।

জানা গেছে, আজ সমাজকল্যাণ বিভাগে ইফতার মাহফিল ছিল। সে কারণে বেলা ৩টায় অফিস সময় শেষ হলেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিভাগে অবস্থান করছিলেন। বিকেল ৪টার দিকে বিভাগের সভাপতির নিজ কক্ষ থেকে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনে ভবনের নিচে দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা দরজায় ধাক্কাধাক্কি করেন। একপর্যায়ে বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীও কারণ জানতে কক্ষের সামনে উপস্থিত হন। পরে তিনজন শিক্ষার্থী, দুজন আনসার সদস্য ও আরও দুজন মিলে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে তাঁরা আসমা সাদিয়ার রক্তাক্ত দেহ মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন এবং ফজলুর রহমানকে নিজের গলায় অস্ত্র দিয়ে কাটার চেষ্টা করতে দেখেন। পরে শিক্ষার্থী ও কর্তব্যরত আনসার সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি এবং পার্শ্ববর্তী ইবি থানাকে খবর দেন। তারা ঘটনাস্থলে এসে দুজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে পাঠায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার আগে ফজলুর সভাপতির কক্ষে প্রবেশ করে প্রথমে কথা-কাটাকাটিতে জড়ান। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তিনি সঙ্গে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আসমা সাদিয়ার গলায় আঘাত করেন। হামলার আকস্মিকতায় উপস্থিত শিক্ষক-কর্মকর্তারা হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। চিৎকার শুনে আশপাশের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ছুটে এসে আহত দুজনকে উদ্ধার করেন। পরে তাঁদের দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ইমাম হোসাইন জানান, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে হাসপাতালে আনার আগেই শিক্ষিকার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল। পরে ইসিজি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হন তিনি মারা গেছেন। তাঁকে গলাকাটা, হাত ও পায়ে অস্ত্রের আঘাত অবস্থায় পাওয়া গেছে। ইমাম হোসাইন বলেন, ধারালো অস্ত্র দিয়ে শিক্ষিকার গলায় আঘাত করা হয়েছিল। এ ছাড়া আহত ফজলুরের শ্বাসনালি কেটে গেছে। তাঁর অবস্থাও আশঙ্কাজনক।

ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুদ রানা বলেন, ‘ঘটনা জানতে পেরে তাঁদের উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে পাঠাই। সেখানের কর্তব্যরত চিকিৎসক শিক্ষিকাকে মৃত ঘোষণা করেন। অপরজন অপারেশন থিয়েটারে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তদন্ত করে পরে ঘটনা জানা যাবে।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, ‘আমরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হই। সেখানে রক্তাক্ত অবস্থায় দুজনকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে পাঠাই। এ সময় শিক্ষিকা রুনাকে নিথর অবস্থায় পাওয়া যায়।’

ঘটনার পরপরই ক্যাম্পাসজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দুরবস্থা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অনেকেই দাবি করেন, প্রশাসনিক বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে চললেও যথাযথ সমাধান না হওয়ায় এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক জরুরি বৈঠকে ঘটনার নিন্দা জানিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কীভাবে একটি ধারালো অস্ত্র নিয়ে কোনো কর্মচারী অনায়াসে বিভাগীয় চেয়ারম্যানের কক্ষে প্রবেশ করলেন—তা খতিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে বেতনসংক্রান্ত ও বদলিসংক্রান্ত অভিযোগগুলোও তদন্তের আওতায় আনা হবে।

এ ঘটনায় শিক্ষক সমিতি ও কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতি পৃথক বিবৃতি দিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সহিংসতা কেবল ব্যক্তি আক্রমণ নয়, পুরো একাডেমিক পরিবেশের ওপর আঘাত। দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে তারা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত