Ajker Patrika

বেটিং ও জুয়া প্রতিরোধ আইনের খসড়া: সন্দেহ হলেই তল্লাশি, গ্রেপ্তার করতে পারবে গোয়েন্দারা

  • সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তথ্য সংরক্ষণে হবে ‘জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট’।
  • এ-সংক্রান্ত সব অপরাধ অজামিনযোগ্য ও আপস-অযোগ্য করার প্রস্তাব।
  • খসড়ার কিছু বিধানকে নজরদারির ও নিবর্তনমূলক বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্চি হক, ঢাকা 
আপডেট : ০৫ জুন ২০২৬, ২০: ২৪
বেটিং ও জুয়া প্রতিরোধ আইনের খসড়া: সন্দেহ হলেই তল্লাশি, গ্রেপ্তার করতে পারবে গোয়েন্দারা
প্রতীকী ছবি

কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জুয়াসংক্রান্ত অপরাধের যুক্তিসংগত সন্দেহ থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা পেতে যাচ্ছে। জুয়া ও বেটিং প্রতিরোধে সরকার যে নতুন আইন করতে যাচ্ছে, তার খসড়ায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও এই ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

‘বেটিং ও জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ নামে এই আইনের খসড়ায় এসব অপরাধকে অজামিনযোগ্য ও আপস-অযোগ্য করার প্রস্তাব রয়েছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তথ্য সংরক্ষণে ‘জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট’ তৈরির বিধানও রাখা হয়েছে খসড়ায়।

নতুন আইনের খসড়ায় নজরদারি এবং সন্দেহের ভিত্তিতে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতার বিধানের অপব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা খসড়াটি সংসদে উত্থাপনের আগে নিবর্তনমূলক ধারাগুলোর উপযুক্ত সংশোধনসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অংশগ্রহণে পর্যাপ্ত পর্যালোচনার তাগিদ দিয়েছেন।

খসড়ায় বলা হয়েছে, ১৮৬৭ সালের প্রকাশ্য জুয়া আইন বর্তমান ডিজিটাল যুগের অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো, ক্রিপ্টোকারেন্সি-ভিত্তিক জুয়া, ভুয়া সিম ও ডিজিটাল আর্থিক জালিয়াতি প্রতিরোধে অকার্যকর ও অপর্যাপ্ত। তাই নতুন আইন হচ্ছে।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মান্ধাতার আমলের জুয়া প্রতিরোধ আইন দিয়ে বর্তমান সময়ের অপরাধ দমন সম্ভব হচ্ছে না। জুয়া, বেটিং ও অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে যুগোপযোগী ও আধুনিক আইন প্রণয়নের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। নতুন এই আইনের মাধ্যমে অনলাইন জুয়াসহ এসব অপরাধ নির্মূল করা হবে এবং অপরাধীদের উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করা যাবে। তিনি জানান, সংসদের আগামী অধিবেশনেই আইনটি পাসের জন্য বিল আকারে পেশ করা হবে।

‘বেটিং ও জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৩৭ ধারায় আইনের আওতায় সংঘটিত সব অপরাধকে আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য ও আপস-অযোগ্য হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

৩৬ ধারায় এসব অপরাধের বিচার ভ্রাম্যমাণ আদালতের (মোবাইল কোর্ট) মাধ্যমে পরিচালনার বিধান রাখা হয়েছে। ফলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচার ও দণ্ড দেওয়ার সুযোগ থাকবে।

৩৯ ধারায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জুয়া-সংক্রান্ত অপরাধের যুক্তিসংগত সন্দেহ থাকলে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ক্ষমতা ম্যাজিস্ট্রেট, থানা-পুলিশ, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), র‍্যাব ও অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থার কর্মকর্তারাও প্রয়োগ করতে পারবেন।

৪৩ ধারায় ‘জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট’ (কালো তালিকা) গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই তালিকায় জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর, মোবাইল ফোন নম্বর, ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব, ডিজিটাল ওয়ালেট, ব্যবহৃত ডিভাইস, ডোমেইন নাম, আইপি ঠিকানা, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। তবে কাউকে কী প্রক্রিয়ায় এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে, কত দিন রাখা হবে কিংবা ভুলবশত অন্তর্ভুক্ত হলে প্রতিকারের সুযোগ কী থাকবে, সে বিষয়ে খসড়ায় স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।

৪৪ ধারায় এনআইডি, মোবাইল সিম এবং আর্থিক হিসাবের তথ্য একীভূতভাবে যাচাইয়ের ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে। একই ধারায় ফেশিয়াল রিকগনিশন ও বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশনের সুযোগও রাখা হয়েছে। এর ফলে একজন ব্যক্তির পরিচয়, যোগাযোগ এবং আর্থিক লেনদেন-সম্পর্কিত তথ্য একই কাঠামোর আওতায় পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।

আইনের ৪৭ ধারায় সরকারকে ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ ও তথ্যপ্রবাহ পর্যবেক্ষণের জন্য ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন (ডিপিআই) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিপিআই প্রযুক্তির মাধ্যমে ইন্টারনেট ট্রাফিকের ভেতরের তথ্যও বিশ্লেষণ করা সম্ভব।

বর্তমানে কার্যকর সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এ অনলাইন জুয়া পরিচালনা বা প্রচারের জন্য বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড অথবা এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে নতুন আইনের খসড়ায় একই ধরনের অপরাধের জন্য ৭ থেকে ১২ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে।

খসড়ায় জুয়ায় আসক্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং, ম্যাচ ও স্পট ফিক্সিংকে পৃথক অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের বিধানও রাখা হয়েছে।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও গবেষক আসিফ শাহরিয়ার সুস্মিত বলেন, ‘বেটিং ও জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর খসড়া ওপরে-ওপরে দেড় শ বছরের পুরোনো ঔপনিবেশিক একটি আইনের আধুনিকায়ন। কিন্তু ধারা ধরে ধরে পড়লে বেরিয়ে আসে অন্য এক চিত্র। এটি আদতে যতটা না জুয়াবিরোধী আইন, তার চেয়ে অনেক বেশি একটি নজরদারি ও দমননির্ভর কাঠামো।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনলাইন ও অফলাইন জুয়া ও বেটিং-সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন অপরিহার্য। কিন্তু আইনটির খসড়ায় কোনো পরোয়ানা বা বিচারিক নজরদারি ছাড়া যেকোনো ব্যক্তির যেকোনো প্রকার ডিজিটাল ডিভাইসে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তার করার অবারিত ক্ষমতা বেশ কিছু সংস্থা বা অন্য কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে জুয়া বা বেটিং নিয়ন্ত্রণের নামে সম্পূর্ণ নজরদারিভিত্তিক রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি হবে। এমন কিছু সংস্থা এ আইন অপব্যবহারের সুযোগ পেতে যাচ্ছে, যাদের হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বর্তমানে ক্ষমতাসীনসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী প্রায় সব রাজনৈতিক দলের অনেক নেতা-কর্মী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকের রয়েছে। তাই খসড়াটি সংসদে উত্থাপনের আগে নিবর্তনমূলক ধারাগুলোর উপযুক্ত সংশোধনসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে পর্যাপ্ত পর্যালোচনা সাপেক্ষে অগ্রসর হওয়া উচিত।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত