Ajker Patrika

ওসমান হাদি হত্যা মামলা: তদন্তে মমতার বক্তব্যকে গুরুত্ব দিচ্ছে সিআইডি

  • কাকে দিয়ে খুন করানো হয়েছিল, সব জানেন বলে দাবি মমতার
  • এই বক্তব্যসহ সব তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে সিআইডি
  • সরকার মমতার ওই বক্তব্যকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখছে
  • জামায়াতে ইসলামীর মতে, বিষয়টি ভারতের রাজনৈতিক খেলা
শাহরিয়ার হাসান, ঢাকা 
ওসমান হাদি হত্যা মামলা: তদন্তে মমতার বক্তব্যকে 
গুরুত্ব দিচ্ছে সিআইডি

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা জানিয়েছে মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সংস্থাটি বলেছে, তদন্তের স্বার্থে মমতার বক্তব্যসহ সব তথ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

অবশ্য সরকার ওই বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ হিসেবে দেখেছে। আর বিরোধী দল একে অভিহিত করেছে ‘ভারতের রাজনৈতিক খেলা’ হিসেবে। এদিকে এই মামলার বাদী হিসেবে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবেরের নাম দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাদির বোন মাসুমা হাদি।

গত বছরের ডিসেম্বরে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর থেকে ইনকিলাব মঞ্চ ঘটনার সঙ্গে ভারতের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করে আসছে। তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যের পর সেই অভিযোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। সংগঠনটি ওই মন্তব্যের পর এই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দেশীয় খুনিদের চিহ্নিত করা, পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনা ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবিতে নতুন করে কর্মসূচি পালন করছে। এসব দাবিতে গতকাল শুক্রবার বাদ জুমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ইনকিলাব মঞ্চ।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির কাছে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের প্রায় এক মাস পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশে আলোচিত হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে মন্তব্য করেন। পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেল এলাকায় গত মঙ্গলবার এক প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের আসামিদের পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তারের পর ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (অমিত শাহ) তাঁকে বিষয়টি প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছিলেন।

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন গণমাধ্যমে মমতার ওই বক্তব্যের ভিডিও প্রচারিত হয়। সেখানে তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে একটা বড় খুনি পশ্চিমবঙ্গে এসেছিল। মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে তারা ঢুকেছিল। বাংলায় আসার পর আমাদের এসটিএফ তাদের গ্রেপ্তার করে। কিন্তু তারপর ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে ফোন করে বলেন, বিষয়টি যেন বাইরে না যায়। কারণ, এটা দেশের ব্যাপার। কাকে দিয়ে খুন করানো হয়েছিল, কারা জড়িত ছিল, সব আমি জানি। আজকের সরকার পরিবর্তন হলেও আমি সবটাই জানি।’ তিনি বলেন, ‘আমি সেই নাম বলতে চাই না। বললে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে। দেশের স্বার্থে সেই নাম প্রকাশ করব না।’

চলতি বছরের মার্চে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ) হাদি হত্যা মামলার প্রধান দুই আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল এবং আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করে। পরে নদীয়ার শান্তিপুর থেকে এ মামলার আরেক আসামি ফিলিপ সাংমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ফিলিপের বিরুদ্ধে মামলার প্রধান দুই আসামিকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে।

হাদি হত্যা মামলার তদন্ত চলমান অবস্থায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এমন মন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান ও পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আলী আকবর খান গত বৃহস্পতিবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা সব পক্ষের বক্তব্য, সম্ভাব্য তথ্য ও সংশ্লিষ্ট বিষয় যাচাই-বাছাই করবেন। ইউনিটপ্রধান ও তদারকি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি সব তথ্য ও বিষয় আমলে নিয়ে তদন্ত চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যেখান থেকেই কোনো তথ্য বা বক্তব্য পাওয়া যাক না কেন, সবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যও আমরা গুরুত্বসহকারে দেখছি। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গেও কথা বলা হবে।’

ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া এই মামলার প্রধান আসামিসহ তিন আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলী আকবর খান বলেন, সিআইডির পক্ষ থেকে আইনি প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র পাঠানো হয়েছে। এখন তাঁরা সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছেন।

এদিকে মমতার ওই বক্তব্যের পরদিন বুধবার জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব ও হাদি হত্যা মামলার বাদী আবদুল্লাহ আল জাবের দাবি করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে ভারত এবং দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার মমতার বক্তব্যকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখছে। এ বিষয়ে করা প্রশ্নে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘পাশের দেশে একটি নির্বাচন হয়েছে। সেখানে পরাজয়ের পর তিনি (মমতা) তাদের সরকারের উদ্দেশে কিছু কথা বলেছেন। সেটি আমাদের আলোচনার বিষয় নয়।’ হাদি হত্যার বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘হাদির হত্যাকারীদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করতে হবে। আমরা এ বিষয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করছি এবং কিছু অগ্রগতিও হয়েছে। কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বিষয়টি এগিয়ে নিতে হবে।’

জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী বিষয়টি দেখছে ভারতের রাজনৈতিক খেলা হিসেবে। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গণমাধ্যমকে বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কারও নাম উল্লেখ করেননি। তবে তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভারত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত এবং আধিপত্যবাদী চিন্তা থেকে এ দেশের সরকারের ওঠা-নামার রাজনীতিতে ভারত যে খেলা খেলে বলে বলা হয়, সেই খেলাতেই তারা মেতে উঠেছে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে ব্যাটারিচালিত রিকশায় থাকা ওসমান হাদিকে গুলি করে মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তরা। মাথায় গুলিবিদ্ধ হাদি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে মারা যান। মামলার তদন্ত শেষে ডিবি পুলিশ ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। তবে অভিযোগপত্রের বিষয়ে মামলার বাদী আবদুল্লাহ আল জাবেরের করা নারাজি আবেদন মঞ্জুর করে আদালত ১৫ জানুয়ারি মামলাটির অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন।

এর পর থেকে মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে। এ মামলার আসামিদের মধ্যে এ পর্যন্ত ভারতে তিনজন এবং বাংলাদেশে ১১ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। দেশে গ্রেপ্তার ১১ জনের মধ্যে ৯ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

পরে এ মামলায় রুবেলকে কেরানীগঞ্জ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রের বিক্রেতা মাজেদুলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন শরিফ ওসমান হাদি। ইনকিলাব মঞ্চ নামে একটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন।

এদিকে ওসমান হাদির বোন মাসুমা হাদি গতকাল নিজের ফেসবুক আইডিতে এক দীর্ঘ পোস্টে ওই সময়ের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। পোস্টে তিনি লিখেছেন, ওসমান হাদি হত্যার পর থেকে তাঁদের পরিবারের বিরুদ্ধে আরও বড় ধরনের ষড়যন্ত্র হয়েছে, কিন্তু ভাইয়ের স্বার্থে তিনি এত দিন সে বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। তবে দুই দিন ধরে মামলার বাদী হওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে, তাতে বাধ্য হয়েই বিষয়টি স্পষ্ট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার দিনের স্মৃতিচারণা করে তাঁর বোন লেখেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালে যান এবং পুরো সময় ভাইয়ের পাশেই ছিলেন। হাসপাতালে অবস্থানকালে তিনি একমুহূর্তের জন্যও সেখান থেকে সরেননি। এ অবস্থায় প্রশাসনের লোকজন হাসপাতালে এসে কেন আবদুল্লাহ আল জাবেরের (ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব) কাছ থেকে মামলার কাগজে স্বাক্ষর নিলেন এবং পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকেই বাদী করা হলো?

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত