Ajker Patrika

পাগলা মসজিদে ৬ মাসে মিলল প্রায় ১৬ কোটি টাকা

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
আপডেট : ২৭ জুন ২০২৬, ২১: ১৮
পাগলা মসজিদে ৬ মাসে মিলল প্রায় ১৬ কোটি টাকা
বস্তায় টাকা ভর্তি করছেন জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন। ছবি: আজকের পত্রিকা

ছয় মাস পর আবারও কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের লোহার সিন্দুক এবং অস্থায়ী ট্রাংকের দানবাক্স খোলা হয়েছে। এই দানবাক্সগুলো খুলে ৪৩ বস্তা দেশি-বিদেশি মুদ্রাসহ সোনা ও রুপার অলংকার পাওয়া গেছে। দিনভর গণনা শেষে ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা পাওয়া গেছে।

সাধারণত প্রতি তিন মাসে একবার খোলা হলেও এবার দীর্ঘ ৬ মাস পর খোলা হয়েছিল মসজিদের ১৩টি দানবাক্স। সকালে জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিনের উপস্থিতিতে তালা খোলা হয়। একে একে ৪৩টি বড় বস্তায় ভরা হয় টাকা। এরপর টাকা গণনার জন্য বস্তাগুলো মসজিদের দোতলায় নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে বস্তা থেকে টাকা মেঝেতে ঢেলে দেওয়ার পর শুরু হয় অর্থ গণনার কাজ। যেখানে অংশ নেন পাগলা মসজিদ-সংলগ্ন মাদ্রাসার ১০৬ জন ও আল-জামিয়াতুল ইমদাদিয়া মাদ্রাসার ৩০০ জন ছাত্র। তাদের সঙ্গে দিনভর টাকা গণনা করেন রূপালী ব্যাংকের ১৩০ জন কর্মকর্তা, পাগলা মসজিদের ৩৫ জন স্টাফ এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ১৯ জন স্টাফ। গণনা শেষে রাত সাড়ে ৮টায় চূড়ান্ত টাকার পরিমাণ ঘোষণা করেন কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও দানবাক্স খোলা কমিটির আহ্বায়ক মো. এরশাদুল আহমেদ।

টাকা খোলা থেকে শুরু করে ব্যাংকে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সময় সশরীর মাঠে ছিলেন জেলা প্রশাসনের ১৩ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ৪০ জন পুলিশ সদস্য, ৮ জন র‍্যাব সদস্য ও ২০ জন আনসার সদস্য।

এর আগে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর ৩ মাস ২৭ দিন পর মসজিদের দানবাক্সগুলো খুলে দানবাক্স থেকে ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা পাওয়া যায়। এ ছাড়াও পাওয়া গিয়েছিল বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার।

ময়মনসিংহের গফরগাঁও থেকে আসা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলেটার বিয়ের পর পাঁচ বছর কোনো সন্তান হচ্ছিল না। অনেক ডাক্তার দেখিয়েও যখন কাজ হয়নি, তখন এই পাগলা মসজিদে এসে আল্লাহর ওয়াস্তে মানত করেছিলাম—যদি আমার ঘরে নাতি-নাতনি আসে, তবে এসে বড় অঙ্কের টাকা দান করব। আল্লাহ আমার মানত কবুল করেছেন, গত মাসে আমার ঘরে ফুটফুটে এক নাতনি এসেছে। আজ সেই মানতের টাকা দিতেই এখানে এসেছি।’

মসজিদের দানবাক্সে শুধু মুসলিমরা নন, নিয়মিত দান করেন অন্য ধর্মের লোকেরাও।

নেত্রকোনার দুর্গাপুর থেকে আসা বাসন্তী রানী বর্মন বলেন, ‘আমার মেজ মেয়েটা এক জটিল রোগে ভুগছিল, কোনো চিকিৎসাতেই কাজ হচ্ছিল না। তখন পরিচিত কয়েকজনের মুখে শুনে মনে মনে মানত করেছিলাম, মেয়েটা সুস্থ হলে পাগলা মসজিদে গিয়ে সোনার গয়না দান করব। ভগবান আমার দিকে তাকিয়েছেন, মেয়েটা এখন পুরোপুরি সুস্থ। আজ সেই মানত পূরণ করতেই নিজের কানের সোনার দুল দান করে গেলাম।’

জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন বলেন, পাগলা মসজিদের প্রতি মানুষের এক গভীর আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে। যার প্রতিফলন দেখা যায় এই দানবাক্সগুলোয়। মানুষের এই আমানত অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত মসজিদের সরাসরি দানের ১১৪ কোটি টাকা এবং চলতি বছরের ২৬ জুন পর্যন্ত অনলাইনে দানের ২৪ লাখ ৭৬ হাজার ৮৮২ টাকা ব্যাংকে জমা রয়েছে। এ ছাড়া মানুষের দান করা বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রাসহ বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার ও রুপা জেলা প্রশাসনের ট্রেজারিতে সম্পূর্ণ নিরাপদ হেফাজতে রাখা হয়েছে।

সোহানা নাসরিন আরও বলেন, এই দানের টাকা কোনো ব্যক্তিগত খাতে ব্যবহারের সুযোগ নেই। জমা করা এই বিশাল অর্থ জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার উন্নয়ন ও পরিচালনায় অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি অসহায়, দরিদ্র ও জটিল রোগে আক্রান্ত মুমূর্ষু মানুষের চিকিৎসায় এবং কল্যাণে এই তহবিল থেকে বড় অঙ্কের অর্থ সহায়তা করা হয়ে থাকে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত