Ajker Patrika

লুটের ভয়ে গরু-ছাগল আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠাচ্ছে শৈলকুপার মানুষ

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
লুটের ভয়ে গরু-ছাগল আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠাচ্ছে শৈলকুপার মানুষ
পুলিশের উপস্থিতিতে গরু-ছাগল আত্মীয় বাড়িতে পাঠানো হচ্ছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজন কৃষক নিহতের ঘটনায় গ্রামজুড়ে লুটপাট ও বাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে গ্রামটি। গ্রামের লোকজন লুটপাটের হাত থেকে গরু-ছাগল রক্ষায় আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

রোববার সকাল থেকে দিনব্যাপী পুলিশের উপস্থিতিতে আসামিপক্ষের গরু-ছাগল নিরাপদ রাখতে স্বজনদের কাছে বুঝে দেওয়া হয়। গ্রামের প্রায় ১৫টি পরিবার গাড়িতে করে বিভিন্ন গ্রামে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে পুলিশের উপস্থিতিতে প্রায় ২৫টি গরু ও ছাগল পাঠিয়ে দেয়। সে সময় পুলিশকে তাদের নাম-পরিচয় এবং গরু-ছাগলের সঙ্গে ছবি তুলে রাখতে দেখা যায়।

গত বৃহস্পতিবার সকালে শৈলকুপা উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন, শৈলকুপা উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব আবুল বাশার তরিকুল সাদাত ও জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু জাহিদ চৌধুরীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে মোহন শেখ (৬০) নামের একজন কৃষক নিহত হন। নিহত মোহন শেখ আবু জাহিদ চৌধুরীর সমর্থক ছিলেন। এই ঘটনায় ৪২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ২৫-২৬ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে থানায় হত্যা মামলা করেন নিহতের ছেলে আব্দুর রশিদ শেখ।

আবুল হোসেন গ্রুপের নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করছেন, হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই আবু জাহিদ গ্রুপের লোকজন তার গ্রুপের সমর্থকদের বাড়িতে লুটপাট ও ভাঙচুর চালায়। দুই দিনে ৪০টি বাড়ি ও দোকানপাঠ ভাঙচুর করে এবং অন্তত ৬৫টি গরু-ছাগল লুট করে নিয়ে যায়। এর মধ্যে কিছু গরু-ছাগল পুলিশ উদ্ধার করে দিয়েছে। মামলার কারণে বাড়িছাড়া আবুল হোসেন গ্রুপের পুরুষ সদস্যরা। সেই সুযোগে আবারও লুটপাটের ভয়ে গরু-ছাগল ও মূল্যবান জিনিসপত্র আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।

সরেজমিনে রোববার দুপুরে কথা হয় মাধবপুর গ্রামের সুফিয়া খাতুন নামে এক নারীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, যারা হত্যা করেছে, তাদের বিচার হোক। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে গ্রামের যারা আবুল হোসেনের সমর্থক কিন্তু ভালো মানুষ, তাদের নামেও মামলা দিয়েছে। এই কারণে প্রায় বাড়িতেই পুরুষ মানুষ নেই। কখন আমাদের গরু লুট করে নিয়ে যায়, সেই ভয়ে আত্মীয় বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

মনিরা খাতুন নামের এক নারী তাঁর বৃদ্ধ শ্বশুরকে নিয়ে গরু পাঠাতে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘বৃদ্ধ ও শিশুরা ছাড়া আমাদের সমাজে কোনো পুরুষ বাড়িতে নেই। আমাদের একটি গরু কোরবানির ঈদের জন্য লালন-পালন করছিলাম। ঈদের বাজারে তুললে দুই লাখের ওপরে দাম হবে। কখন লুট হয়ে যায় এই ভয়ে আমার মামাশ্বশুরের বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু জাহিদ চৌধুরী বলেন, ‘এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। হত্যাকাণ্ডের পরও আমরা আইনমন্ত্রীর নির্দেশে এলাকা শান্ত রাখার চেষ্টা করছি। হত্যার সময় আমার গ্রুপের অন্তত ১৫টি বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে প্রতিপক্ষের লোকজন। তারা নিজেরা গরু সরিয়ে ফেলে আমাদের নামে অভিযোগ দিচ্ছে গরু লুটের। হত্যার দিন থেকেই দুই বেলা প্রায় ২০ জন পুলিশ সদস্যকে খাবার দিচ্ছি। আমি নেতা-কর্মীদের নিয়ে পাহারা দিচ্ছি। কিন্তু আমি কতক্ষণ পাহারা দিয়ে রাখব। তাই যাদের বাড়িতে বড় গরু-ছাগল রয়েছে, পুলিশের কাছে নাম লিখিয়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে পাঠানো ব্যবস্থা করেছি; যাতে আমার গ্রুপের লোকজনের বিরুদ্ধে গরু লুটের অভিযোগ করতে না পারে।’

উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেনের ছেলে ও উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব আবুল বাশার তরিকুল সাদাত বলেন, ‘হত্যার দিন থেকে গতকাল রাত পর্যন্ত আবু জাহিদের লোকজন আমাদের গ্রুপের অন্তত ৪০টি বাড়ি ভাঙচুর করেছে এবং ৭০টির মতো গরু লুট করে নিয়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে অভিযোগ দিলে ১৫-২০টির মতো গরু উদ্ধার করে মালিকের হেফাজতে দিয়েছে। এখনো থানায় কয়েকটি উদ্ধার করা গরু রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আবু জাহিদ মনোহরপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করবেন। আমার বাবা আবুল হোসেনও এই ইউনিয়নে নির্বাচনে করবেন। সেই কারণে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয়; কিন্তু আমাদের গ্রুপ করে এমন মানুষদের নামে মামলা দিয়ে রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। মামলার কারণে মাধবপুর গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। মানুষের বাড়ি ঘরের কোনো নিরাপত্তা নেই।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও শৈলকুপা থানার এসআই আবুল কাশেম বলেন, ‘শনিবার নিহতের ছেলে বাদী হয়ে ৪২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ২৫-২৬ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করেছেন। মামলার মূল আসামিকে পুলিশ ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে। বৃহস্পতিবার সংঘর্ষের পর থেকেই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা রয়েছে। আমরা অভিযোগ পেয়ে বেশ কয়েকটি গরু উদ্ধার করে মালিকের হাতে দিয়েছি। আজকে প্রায় ১৫টি পরিবারের গরু-ছাগল তাদের আত্মীয় বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।’

তিনি বলেন, মামলা হওয়ার পরে আসামিরা পলাতক। পুলিশ তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু তাদের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ঢাবি ছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার, শিক্ষক ও বন্ধু পুলিশ হেফাজতে

শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পর্যালোচনার আড়ালে ঢাকাকে কী বার্তা দিল দিল্লি

হোয়াইট হাউসের ডিনারে হামলা: মেধাবী প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক অ্যালেন কেন অস্ত্র তুলে নিলেন

গুরুকে হত্যার পরিকল্পনা ফাঁস, শিষ্য রকি প্রকাশ্যে খুন: বগুড়ায় সন্ত্রাসী চক্রের দ্বন্দ্ব ভয়ংকর

ট্রাম্পের অনুষ্ঠানে গুলি: আটক যুবক সম্পর্কে যা জানা গেল

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত