Ajker Patrika

পদ্মার চরে সন্ত্রাসীদের হাতে আধুনিক অস্ত্র, বাড়ছে উদ্বেগ

  • কুষ্টিয়া, পাবনা, নাটোর ও রাজশাহীর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে ডজনের বেশি সন্ত্রাসী বাহিনী সক্রিয়।
  • আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, লুটতরাজ ও জমি দখলকে কেন্দ্র করে ঘটছে হত্যাকাণ্ড।

অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। চোরাচালানের মাধ্যমে এসব অস্ত্র আসতে পারে।

দেলোয়ার হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, কুষ্টিয়া

তামিম আদনান, দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) 
পদ্মার চরে সন্ত্রাসীদের হাতে আধুনিক অস্ত্র, বাড়ছে উদ্বেগ

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের চার জেলা কুষ্টিয়া, পাবনা, নাটোর ও রাজশাহীর বিস্তীর্ণ পদ্মার চরাঞ্চলে সক্রিয় হয়ে উঠেছে এক ডজনের বেশি সন্ত্রাসী বাহিনী। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, লুটতরাজ ও জমি দখলকে কেন্দ্র করে এসব গোষ্ঠীর মধ্যে একের পর এক ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা। এসব সংঘাত ও অপরাধ কর্মকাণ্ডে সন্ত্রাসীদের একে ৪৭-এর মতো অত্যাধুনিক ভারী অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সাম্প্রতিক কয়েকটি সংঘর্ষে ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন ও গুলির আলামত দেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তবে তাঁরা এসব অস্ত্র কীভাবে সন্ত্রাসীদের হাতে পৌঁছেছে, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানাতে পারেননি।

ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় চোরাচালানের মাধ্যমে এই অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের ধারণা, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত ব্যবহার করে অবৈধ চোরাচালানের মাধ্যমে একে ৪৭ ও অন্যান্য অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দেশে প্রবেশ করে থাকতে পারে। পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ব্যবহৃত আধুনিক অস্ত্রের মতো এসব অস্ত্রও আধুনিক। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্রের একটি অংশও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হাতে চলে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া এবং রাজশাহীসহ বিভাগের আরও দুটি জেলা পাবনা ও নাটোর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ পদ্মা নদী। এই নদীর চরাঞ্চলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে একাধিক সশস্ত্র বাহিনীর আধিপত্য। দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এসব এলাকায় অপরাধীরা অনেক সময় নদীপথে সহজেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়।

দায়িত্বশীল বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী থেকে পাবনা পর্যন্ত প্রায় ৮৯ কিলোমিটার পদ্মা নদীজুড়ে এক ডজনের বেশি সন্ত্রাসী বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ বালু উত্তোলন, চরাঞ্চলের কৃষিজমি দখল, গবাদিপশু লুট, চাঁদাবাজি এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এসব বাহিনী। ফলে চরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিরতা বিরাজ করছে।

কুষ্টিয়ার চরাঞ্চলের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চরাঞ্চলে প্রায় সময়ই গোলাগুলি ও সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া যায়। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাহিনীগুলোর নেতৃত্ব ও সদস্যদের মধ্যে পরিবর্তন এলেও তাদের অস্তিত্ব পুরোপুরি নির্মূল হয় না। বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ রক্ষা ও অবৈধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে এসব বাহিনীর সদস্যদের ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। একসময় পদ্মার চরাঞ্চলে পান্না ও লালচাঁদ বাহিনীর একক আধিপত্য থাকলেও সময়ের ব্যবধানে তাদের সদস্যরা পৃথক গ্রুপ গঠন করেছে। ফলে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে একাধিক সশস্ত্র বাহিনীর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে রাজশাহীর বাঘা এলাকার মণ্ডল বাহিনী এবং পাবনার ঈশ্বরদীর কাঁকন বাহিনীর মধ্যে পদ্মা নদী ও দুর্গম চরাঞ্চলে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। বালু উত্তোলন ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের চৌদ্দ হাজার মৌজার হবির চর এলাকা থেকে রাজশাহীর বাঘার আলাইপুর চর পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে শতাধিক গুলি ছোড়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় কাঁকন বাহিনীর সদস্য ও কথিত বালুমহালের ব্যবস্থাপক আজিজুল হক ঝড়ু (৩৫) নিহত হন। তিনি নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া উপজেলার আব্দুল শেখের ছেলে। পরে নাটোরের লালপুর উপজেলার চরজাজিরা এলাকার পদ্মা নদী থেকে একটি স্পিডবোটে থাকা তাঁর লাশ উদ্ধার করে ঈশ্বরদীর লক্ষ্মীকুণ্ডা নৌ-পুলিশ।

এর আগে গত বছরের ২৭ অক্টোবর পদ্মার চরের কাশবনের জমি দখলকে কেন্দ্র করে মণ্ডল ও কাঁকন গ্রুপের সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়। ওই ঘটনায় মণ্ডল গ্রুপের দুজন এবং কাঁকন গ্রুপের একজন সদস্য প্রাণ হারায়। ঘটনার পর চার জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পদ্মার চরে যৌথ অভিযান চালিয়ে অস্ত্রসহ একাধিক আসামিকে গ্রেপ্তার করে।

জানা গেছে, স্থানীয় সূত্র জানায়, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের নাহারুল বাহিনীসহ একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর পাশাপাশি রাজশাহীর বাঘার বিল্লাল ও মুন্তাজ মণ্ডলের নেতৃত্বাধীন মণ্ডল বাহিনী, পাবনার ঈশ্বরদীর কাঁকন বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে পদ্মার বিভিন্ন চরাঞ্চলে সক্রিয়।

সন্ত্রাসীদের হাতে আধুনিক অস্ত্র পৌঁছানোর বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘এ মুহূর্তে অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় চোরাচালানের মাধ্যমে এসব অস্ত্র আসতে পারে। নিহত ব্যক্তির (আজিজুল হক) শরীরে পাওয়া গুলির আলামত দেখে ধারণা করা হচ্ছে, একে ৪৭-এর মতো ভারী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি।’

কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের হাতে আধুনিক অস্ত্র থাকার বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। ইতিমধ্যে অভিযান শুরু হয়েছে। পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। অস্ত্রধারী অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত