Ajker Patrika

ফিলিং স্টেশনে যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ৩ বাসে আগুন, শ্রমিকদের মহাসড়ক অবরোধ

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৬, ১৫: ৪৬
ফিলিং স্টেশনে যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ৩ বাসে আগুন, শ্রমিকদের মহাসড়ক অবরোধ
বাসে আগুন নেভাতে কাজ করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

ঝিনাইদহে তেল নিতে গিয়ে পাম্পশ্রমিকদের মারধরে নিরব হোসেন নামে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনার পর ওই পাম্পের মালিকের একটি বাসসহ তিন বাসে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ লোকজন। গতকাল শনিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে এই ঘটনা ঘটে। বাসে আগুনের ঘটনায় আজ রোববার সকাল ৯টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা ঝিনাইদহ-মাগুরা-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এরপর প্রশাসনের সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাসে অবরোধ তুলে নেন শ্রমিকেরা। পরে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

এদিকে দুপুরে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সদর হাসপাতালের মর্গে নিহত ওই যুবকের ময়নাতদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। থানায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। তবে ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পাম্পশ্রমিক নাছিম হোসেন, রমিজুল ইসলাম ও দাউদকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

জানা গেছে, শহরের বাস টার্মিনাল এলাকার তাজ ফিলিং স্টেশনে শনিবার রাতে মোটরসাইকেলে তেল নিতে যান নিরব হোসেন (২২) ও তাঁর এক বন্ধু। তখন পাম্পশ্রমিকেরা বলেন, ‘তেল নেই. পাম্প বন্ধ আছে।’ পরে অন্য পাম্পে গিয়ে তেল না পেয়ে তাঁরা ফেরার সময় দেখেন, ওই পাম্পে বোতলে তেল দেওয়া হচ্ছে। তখন তাঁরা শ্রমিকদের বলেন, ‘আপনারা আমাদের তেল দিলেন না, এখন আবার বোতলে বিক্রি করছেন।’ এ নিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা-কাটাকাটির এক পর্যায়ে পাম্পশ্রমিকেরা নিরব হোসেনকে মারধর করেন। তখন তিনি বাসায় ফিরে গিয়ে অসুস্থবোধ করলে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক রাত সাড়ে ৯টার দিকে নিরবকে মৃত ঘোষণা করেন। নিরব হোসেন একটি সিম কোম্পানিতে চাকরি করতেন। তিনি কালীগঞ্জ উপজেলার বাদুরগাছা গ্রামের আলিমুর বিশ্বাসের ছেলে এবং ঝিনাইদহ শহরের বকুলতলা এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।

এই ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাজ ফিলিং স্টেশনে অভিযান চালিয়ে ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিন পাম্পশ্রমিককে আটক করে। নিরবের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে রাত ১টার দিকে বিক্ষুব্ধ লোকজন শহরের আরাপপুরে ওই পাম্পমালিক হারুন অর রশিদের মালিকানাধীন সৃজনী ফিলিং স্টেশনে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। তারা তেল দেওয়ার মেশিনগুলো ভেঙে ফেলে। এর কয়েক ঘণ্টা পর রাত ৩টার দিকে বিক্ষুব্ধ লোকজন ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে দাঁড়িয়ে থাকা জে লাইন পরিবহন, রয়েল এক্সপ্রেস ও নাঈম পরিবহন নামের একটি লোকাল বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ওই পাম্প স্টেশন ও জে লাইন পরিবহন বাসের মালিকের দাবি, নিহত নিরবের পরিচিত ব্যক্তিরা বাসে আগুন দিয়েছে।

এই ঘটনার পর আজ সকালে বিক্ষুব্ধ বাসশ্রমিকেরা ঘটনার তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির দাবিতে ঝিনাইদহ-মাগুরা-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ে যাত্রীরা। পরে এই ঘটনায় প্রশাসনের তদন্তের আশ্বাসে অবরোধ তুলে নেন শ্রমিকেরা।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রোকনুজ্জামান রানু বলেন, ‘আমাদের টার্মিনালে ঢুকে তিনটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। এটা দুঃখজনক ঘটনা। প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, দ্রুত এই ঘটনায় জড়িতদের যেন আইনের আওতায় আনা হয়।’

এদিকে সদর হাসপাতালের মর্গে আসা নিহত নিরব হোসেনের বাবা আলিমুর বিশ্বাস বলেন, ‘রাতে ছেলের মামা ফোন করে মৃত্যুর খবর জানায়। পরে হাসপাতালে আসি। শুনেছি পাম্পশ্রমিকদের মারধরে আমার ছেলে নিরবের মৃত্যু হয়েছে। আমরা এর সঠিক বিচার চাই।’

নিহত ব্যক্তির বন্ধু শান্ত বলেন, ‘আমাদের দিচ্ছে না, অথচ অন্য জায়গায় তেল দিচ্ছে, এমন কেন করা হচ্ছে—বলতেই পাম্পের শ্রমিকেরা নিরবকে মারধর করে। পরে তার মৃত্যু হয়। আমরা এই ঘটনার সঠিক বিচার চাই।’

ঝিনাইদহ ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক তানভীর হাসান বলেন, রাত ৩টার দিকে আগুনের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ২টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আধা ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ করে। আগুনে বাসের সিটসহ বেশ কিছু অংশ পুড়ে যায়।

তাজ, সৃজনী পাম্প ও জে লাইন পরিবহনের মালিক হারুন অর রশিদ বলেন, ‘তাজ পাম্পে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। এটার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। নিহত যুবকের পরিচিতজনেরাই সৃজনী পাম্প ভাঙচুর ও টার্মিনালে আমার একটি বাসসহ অন্যান্য বাসে আগুন দিয়েছে বলে আমার ধারণা। যে ঘটনা ঘটেছে, তার বিচার হবে। তাই বলে একটা বিষয়ে অন্য পাম্পে ভাঙচুর, বাসে আগুন দেওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত।’

ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) শেখ বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘বাস টার্মিনালে কারা বাসে আগুন দিয়েছে, তা শনাক্তের জন্য যত পদ্ধতি প্রয়োগ করা দরকার, আমরা তা করছি। ইতিমধ্যে কিছু বিষয় শনাক্ত করেছি। শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধ করেছিল। তাদের দাবিগুলো শুনেছি এবং তদন্তের কথা জানিয়েছি। বর্তমানে অবরোধ তুলে নিয়েছে। ফলে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক আছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে অগ্নিসংযোগকারীদের আইনের আওতায় আনব।’ তিনি আরও বলেন, ‘যুবক নিহতের ঘটনায় পাম্পের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ চলছে। আসামিদের এরই মধ্যে আটক করা হয়েছে। সঙ্গে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে থানায় মামলা দিতে বলেছি। আশা করছি, দ্রুত সময়ে বিস্তারিত বিষয় জানাতে পারব।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত