Ajker Patrika

দুটি কিডনিই বিকল কিশোর তামিমের, মা একটি দিতে চাইলেও নেই প্রতিস্থাপনের খরচ

আরিফ রহমান, ঝালকাঠি
দুটি কিডনিই বিকল কিশোর তামিমের, মা একটি দিতে চাইলেও নেই প্রতিস্থাপনের খরচ
মায়ের পাশে শিশু তামিম। ছবি: আজকের পত্রিকা

বয়স মাত্র ১৬ বছর। চোখে স্বপ্ন—পড়ালেখা শেষ করে একদিন বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাবে। কিন্তু নির্মম বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন আজ থমকে গেছে হাসপাতালের বিছানায়। ঝালকাঠি সদর উপজেলার শেখেরহাট ইউনিয়নের শিরযুগ গ্রামের কিশোর তামিম ইসলাম মুন্সীর দুটি কিডনিই সম্পূর্ণ বিকল। জীবন বাঁচাতে একমাত্র উপায় কিডনি প্রতিস্থাপন।

দিনমজুর মো. আনিস মুন্সী ও গৃহিণী মনজু খানম দম্পতির বড় সন্তান তামিম। তার ছোট বোন তানিশা (৯) একই মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। ভাইয়ের অসুস্থতায় ভেঙে পড়েছে শিশুটিও। কাঁদতে কাঁদতে সে বলে, ‘আমি চাই আমার ভাই আবার সুস্থ হয়ে মাদ্রাসায় ফিরুক। আমরা আবার একসঙ্গে পড়াশোনা করব, খেলব।’

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ বছর বয়স থেকেই তামিমের শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। দীর্ঘ চিকিৎসা ও পরীক্ষার পর নিশ্চিত হয়—তার দুটি কিডনিই বিকল। চিকিৎসকদের মতে, দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপন না হলে তার জীবন চরম ঝুঁকিতে পড়বে। এ জন্য অপারেশন ও আনুষঙ্গিক চিকিৎসা বাবদ প্রয়োজন অন্তত ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা। ইতিমধ্যে চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে ১০ লাখ টাকার বেশি।

তামিমের মা মনজু খানম নিজের একটি কিডনি দিতে প্রস্তুত। রক্তের গ্রুপও মিলেছে। তবে অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রতিস্থাপন এখনো সম্পন্ন করা যায়নি। বর্তমানে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সপ্তাহে দুবার ডায়ালাইসিস করাতে হচ্ছে, যার প্রতিবার খরচ ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা।

তামিমের বাবা মো. আনিস মুন্সী বলেন, ছেলের চিকিৎসার জন্য জমি-জমা, সহায়-সম্বল সব বিক্রি করেছি। এখন নদীর তীরে সরকারি জমিতে একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছি। আমি শুধু চাই, আমার ছেলেটা সুস্থ হয়ে আবার পড়ার টেবিলে ফিরুক। টাকার অভাবে যদি তাকে হারাতে হয়, সেটা কোনো বাবার পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব।’

শিরযুগ দারুল কোরআন দাখিল মাদ্রাসার সুপার মাওলানা নূরুল আমিন বলেন, ‘তামিম অত্যন্ত ভদ্র, ধার্মিক ও মেধাবী ছাত্র। তার এমন অবস্থায় আমরা সবাই ব্যথিত। সে আবার মাদ্রাসায় ফিরে পড়াশোনা শুরু করুক—এটাই আমাদের একমাত্র কামনা।’

ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা টি এম মেহেদী হাসান (সানি) জানান, বর্তমানে নিয়মিত ডায়ালাইসিসের পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব কিডনি প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন। দেরি হলে শিশুটির জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।

আজকের পত্রিকার মাল্টিমিডিয়ায় ‘ডায়ালাইসিসের কাছে হার মানছে শৈশব, বাঁচতে চায় ১৬ বছরের তামিম’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি ঝালকাঠি জেলা প্রশাসকের নজরে আসে। জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন তাৎক্ষণিকভাবে তামিমের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।

ঝালকাঠি সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক আল মামুন তালুকদার বলেন, ‘সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে কিডনি রোগসহ জটিল ও অসহায় রোগীদের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। কিন্তু তামিমের বিষয়ে আগে কোনো আবেদন আমরা পাইনি। পরে আজকের পত্রিকার মাল্টিমিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি জেলা প্রশাসকসহ আমার নজরে আসে এবং জেলা প্রশাসক মহোদয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন আমাকে।’

আল মামুন তালুকদার আরও বলেন, ‘এরপর আমি নিজে আজকের পত্রিকার প্রতিবেদক ও তামিমের মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তামিমের চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তার আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ইতিমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে এবং আগামী রোববার প্রয়োজনীয় আরও কাগজপত্রসহ পরিবারটিকে সমাজসেবা কার্যালয়ে উপস্থিত হতে বলা হয়েছে।’

আল মামুন বলেন, প্রাথমিকভাবে তামিমের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে এবং আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরেও তার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী পুনরায় সহায়তা দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন বলেন, সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালককে তামিমের পরিবারকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বরিশালে যেখানে বর্তমানে তার ডায়ালাইসিস চলছে, সেখানে যেন সর্বনিম্ন খরচে ডায়ালাইসিস নিশ্চিত করা হয়—সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও শিশুটির চিকিৎসার জন্য সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়া হবে।

পরিবার ও এলাকাবাসী সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষের প্রতি সহায়তার হাত বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত