Ajker Patrika

অবহেলায় আটকে আছে ৯ কোটি টাকার প্রকল্প, দুর্যোগের আশ্রয়কেন্দ্র এখন দুর্ভোগে

মো. জাহিদুল ইসলাম জাহিদ, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা)
অবহেলায় আটকে আছে ৯ কোটি টাকার প্রকল্প, দুর্যোগের আশ্রয়কেন্দ্র এখন দুর্ভোগে
১২ বিঘা জমি বরাদ্দ নিয়ে নির্মাণ হয়েছে মাত্র ৪০টি কলাম। এরপর এক বছর ধরে আশ্রয়কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ বন্ধ। ছবি: আজকের পত্রিকা

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার প্রকল্পে মাত্র ৪০টি কলাম নির্মাণ করা হয়েছে। এর পর থেকে কাজ বন্ধ প্রায় এক বছর ধরে। ঠিকাদার, পিআইওসহ সংশ্লিষ্ট কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এতে একদিকে হাজারো শ্রমিক পড়েছেন মজুরি অনিশ্চয়তায়, অন্যদিকে বানভাসিদের সামনে দেখা দিয়েছে দুর্ভোগের শঙ্কা। পিআইও, ঠিকাদারসহ দায়িত্বশীলদেরই দুষছেন এলাকাবাসী।

উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভাটি বোচাগারির পোড়ারচরে (৮ নম্বর ওয়ার্ড) নির্মাণাধীন দুর্যোগ আশ্রয় কেন্দ্রের এই ঘটনা।

সরেজমিন দেখা গেছে, আশ্রয়কেন্দ্রের জায়গায় বালু ভরাট করা হয়েছে। মানুষের জন্য তিনতলা ও গবাদিপশুর জন্য একটি একতলা বিল্ডিং হওয়ার কথা ছিল। সেখানে গবাদিপশুর বিল্ডিংয়ের ৪০টি কলাম ওঠানো হয়েছে মাত্র। ছিটিয়ে-ছড়িয়ে আছে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত সামগ্রীগুলো। কোথাও বাঁশ, কোথাও ইটের খোয়া আবার কোথাও শাটারের তক্তা। পরে আছে মিক্সচার মেশিন। টিউবওয়েলে ধরেছে মরিচা। কাজের লোকদের থাকার ঘরটিও ভেঙে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে যে এখানে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে সেটি দেখেই বোঝা গেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ‘আমরা বানভাসি মানুষ। বন্যা হলেই গবাদিপশু, আসবাব ও পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হয় বিভিন্ন এলাকায়। সে কারণে দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্রটি আশীর্বাদ মনে করেছিলাম। আর এ কারণে ফসল নষ্ট করে জমি দিয়েছি। আর যা-ই হোক অন্তত বন্যায় যেন ভাসতে না হয়। কিন্তু সে আশায় এখন ছাই। আশ্রয়কেন্দ্র তো এখনো হলোই না, বরং জমিগুলো আবাদ করলে ফসল পাইতাম, সেটাও নাই। আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে বাকিতে লেবারি করেছে যারা, তাদের টাকাটাও বুঝি আর পাওয়া হলো না। দায়িত্বশীলদের গাফিলতির কারণেই এ দুরবস্থা।’

স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. এন্তাজ আলী (৬২) বলেন, ‘এই আশ্রয়কেন্দ্রে জমি লেগেছে ১২ বিঘা। সবগুলোই খাসজমি। আমরা সেগুলো আবাদ করতাম। আশ্রয় প্রকল্পে দিয়েছি। বন্যা হলে যাতে করে এ এলাকার মানুষ আশ্রয় নিতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে এবারও ৪০ থেকে ৫০ মণ ভুট্টা হয়েছে। তাহলে ১২ বিঘা জমিতে আমরা কতগুলো ভুট্টা পেতাম? আর সেই জমিগুলো ’২৪ সালেরও আগে ছেড়ে দিয়েছি। একদিকে আবাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি, অন্যদিকে আশ্রয়কেন্দ্রও হচ্ছে না। মহাবিপদে ফেলেছেন সরকার আমাদের।’ তাই অসমাপ্ত কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানান তিনি।

আরেক সুবিধাভোগী মো. ফজলু মিয়া (৫৫) বলেন, ‘কাজটা শুরু হয়েছে ২০২৪ সালের দিকে। ৬ মাস কাজ হওয়ার পর থেকে বন্ধ আছে। পিআইও, ঠিকাদার কেউ আর আসেন না। ফোন করলেও রিসিভ করেন না। ধরার কোনো লোকও পাইতেছি না। এখানে আমরা পাঁচ থেকে ছয় মাস লেবারি করেছি। চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পাব। সে টাকাও পাইতেছি না। এখন আমরা খুবই অসহায়। কে শুনবে এখন আমাদের কথা।’

কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. হাফিজার রহমান বলেন, ‘কাজটা বন্ধ আছে দীর্ঘদিন ধরে। প্রকল্পে সাধারণ মানুষের প্রায় ১২ বিঘা জমি দেওয়া আছে। কিন্তু কাজ তো হচ্ছে না। বন্যার সময় যদি বানভাসিরা আশ্রয় নিতে না-ই পারে, তাহলে জমি দেওয়ার কী দরকার ছিল।’ কাজটি দ্রুত করার জন্য সরকারের কাছে আকুল আবেদনও জানান তিনি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উষাণ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এই প্রকল্প বরাদ্দ ৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা। নির্মাণকাজের মেয়াদ শেষ হয়েছে। তাই সময় বাড়ানোর কাজ চলছে। সে অপেক্ষায় আছি।’ কত তারিখে ওয়ার্ক অর্ডার হয়েছে এবং কবে শেষ হয়েছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চার থেকে পাঁচ লক্ষ নয়, লেবারেরা হয়তোবা কিছু টাকা পেতে পারেন—সেটি হেড মিস্ত্রির নিকট পাবেন। আমার কাছে না।’

কাজটি তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মশিউর রহমানের মোবাইল ফোনে বহুবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তাঁর দপ্তরে কয়েক দিন গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ প্রকল্পের কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। তবে কাজটি বন্ধ আছে জানি। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ তাই বন্ধ আছে।’ আগামী অ্যাকটিং মিটিংয়ে মেয়াদ বাড়ানো হবে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।

প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত