Ajker Patrika

কুবির মাদকবিরোধী অভিযানের সঙ্গে অপ্রতিম হত্যা জড়িত কি না, তদন্তের দাবি মায়ের

কুমিল্লা প্রতিনিধি
আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮: ৪২
কুবির মাদকবিরোধী অভিযানের সঙ্গে অপ্রতিম হত্যা জড়িত কি না, তদন্তের দাবি মায়ের
গত বছর কুবিতে মাদক বিরোধী অভিযানে আটক ৭ কিশোর। ফাইল ছবি

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে গাঁজাসহ সাত কিশোর আটকের ঘটনার জেরে তাঁর ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও এ ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতা ও পৃষ্ঠপোষকতা খতিয়ে দেখার দাবি তুলেছেন। পুলিশ বলছে, ২০২৫ সালের ওই অভিযানের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র এখনো প্রমাণিত হয়নি।

১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিম। পরদিন সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লালন চত্বরে অভিযান চালিয়ে গাঁজাসহ বহিরাগত সাত কিশোরকে আটক করে প্রক্টরিয়াল বডি। সে সময় ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্বে থাকা বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়।

আটক কিশোরেরা কুমিল্লার ময়নামতি কারিগরি স্কুল ও কলেজ এবং শালবন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলে জানা যায়। তাঁদের ভাষ্যমতে, সবার বয়স ছিল ১৮ বছরের কম। পরে মুচলেকা নিয়ে তাঁদের অভিভাবকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। জব্দ করা গাঁজা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে ধ্বংস করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের ভাষ্য, প্রক্টরিয়াল টিমের নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে ওই অভিযান চালানো হয়েছিল। আটক সাত কিশোরের মধ্যে দুজন তুহিন নামের এক কিশোরের গ্যাংয়ের সদস্য ছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।

একই মাসের ২৩ ফেব্রুয়ারি রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ থেকে মাদকসেবনের অভিযোগে তিনজনকে আটক করে প্রক্টরিয়াল বডি। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের দুজন শিক্ষার্থী এবং কসবার একজন বাসিন্দা ছিলেন।

ড. নাহিদা বেগমের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে তাঁদের বিভাগের ছাত্র পরামর্শক সাইদুল আল-আমিন ও সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মাকসুদল করীমের হেফাজতে দেওয়া হয়। অন্যজনকে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।

পরদিন ২৪ ফেব্রুয়ারি সোমবার সুনীতি শান্তি হলের চার শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মাদক গ্রহণের অভিযোগ তুলে প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন হলের অর্ধশতাধিক আবাসিক শিক্ষার্থী। অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা হলের একটি কক্ষ দখলে নিয়ে নিয়মিত মাদকসেবন করেন। ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ড. নাহিদা বেগম ও হলের প্রাধ্যক্ষ ড. মোছা. শাহিনুর বেগমের কাছে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ওই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় মাদকবিরোধী তৎপরতা জোরদার করা হয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহার (শীলা) আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘২০২৫ সালে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকালে ড. নাহিদা বেগম মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। ওইসব ঘটনায় প্রতিহিংসার জেরে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।’

ড. নাহিদা বেগমের দাবির কথা উল্লেখ করে ড. কামরুন নাহার বলেন, ‘ম্যাডাম চান, পুলিশ তদন্ত করে বের করুক, এসব ঘটনার সঙ্গে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না। বিশেষ করে, আগের কোনো ঘটনার প্রতিশোধ নিতে তাঁর ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হত্যার দ্রুত বিচার ও চার দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবিতে মৌনমিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। কালো ব্যাজ ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বর থেকে মিছিল শুরু হয়। আইন ও প্রকৌশল অনুষদ প্রদক্ষিণ করে প্রধান ফটক হয়ে দক্ষিণ মোড়ে যান শিক্ষার্থীরা। পরে গোলচত্বরে ফিরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কর্মসূচি শেষ হয়।

শিক্ষার্থীদের চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—অপ্রতিম হত্যায় জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তার করে ৬০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা; কুমিল্লার পুলিশ সুপার ও সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবহেলার দায় স্বীকার করে প্রত্যাহার; বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি প্রতিষ্ঠা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের নিরাপত্তায় তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়ার ইউনিট গঠন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাঈম ভূঁইয়া বলেন, ‘অপ্রতিম হত্যায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এ ধরনের কিশোর গ্যাংকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে কি না, তা খুঁজে বের করতে হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘অপ্রতিম হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’ একই সঙ্গে কোটবাড়ি ও লালমাই পাহাড়ি এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানান তিনি।

মোস্তাফিজুর রহমানের ভাষ্য, শুধু একটি আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছে—পুলিশের এ ব্যাখ্যা তাঁরা মেনে নিতে পারছেন না। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ পরিষ্কার হওয়া দরকার।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ড. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ড. নাহিদা বেগম ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকালে ক্যাম্পাসে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়ে অনেককে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ওই অভিযানের কারণে কারও মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়ে থাকলে তা অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তদন্তে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এর আগে গতকাল সোমবার অপ্রতিম হত্যার প্রতিবাদ ও সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বর এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। সেদিনও তাঁরা পুলিশের বক্তব্যে দেওয়া হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইশতিয়াক হাসান আমীন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা সবকিছু নিয়েই তদন্ত করছি। তবে ২০২৫ সালের মাদকবিরোধী অভিযানের সঙ্গে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র এখনো প্রমাণিত নয়।’

ইশতিয়াক হাসান আমীন বলেন, আটক কিশোরদের পরিচয় ও তুহিনের সঙ্গে তাঁদের সংশ্লিষ্টতা, অভিযানের কারণে কারও মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল কি না এবং সেই ক্ষোভ হত্যাকাণ্ডে ভূমিকা রেখেছে কি না—এসব তদন্তের বিষয়। তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত কিছু বলা যাবে না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত