Ajker Patrika

অপরিশোধিত তেলের তুলনায় ডিজেলসহ পরিশোধিত জ্বালানির দাম কেন বেশি বাড়ছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
অপরিশোধিত তেলের তুলনায় ডিজেলসহ পরিশোধিত জ্বালানির দাম কেন বেশি বাড়ছে
ফাইল ছবি

মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ শুধু বাধাগ্রস্তই হচ্ছে না, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিভিন্ন দেশের তেল শোধনাগারও। ফলে শোধনক্ষমতার সংকট ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর প্রভাব পড়ছে পাম্পের ডিজেলসহ অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে। দাম পৌঁছে যাচ্ছে নতুন নতুন রেকর্ডে।

অপরিশোধিত তেলের ঘাটতি কতটা

ফরাসি কর্মকর্তারা সম্প্রতি জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই পরিমাণটি যথেষ্ট বড়। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান সংঘাত শুরুর আগে বিশ্ব অর্থনীতি প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেল ব্যবহার করছিল।

ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় শুরুতে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তবে সৌদি আরব কিছু তেল রপ্তানি লোহিত সাগরের দিকে সরিয়ে নেয় এবং কিছু তেলবাহী জাহাজ আবারও হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল শুরু করে। এখন লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানিও কমে গেছে। কারণ ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা বাব এল–মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

তবে বিশ্ববাজারে এই ধাক্কার প্রভাব কিছুটা কমেছে, কারণ বিভিন্ন দেশের হাতে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত তেলের মজুত ছিল যথেষ্ট। ২০২৫ সালে তেলের উৎপাদন ব্যবহার বা চাহিদার চেয়ে বেশি থাকায় এসব মজুত তৈরি হয়েছিল।

এদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বা আইইএ-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে তেলের ব্যবহার প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি কমেছে। বিশেষ করে চীন অপরিশোধিত তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে এবং অন্য জ্বালানি উৎসের দিকে ঝুঁকেছে।

আইইএর হিসাব অনুযায়ী, তারা যাকে ‘পর্যবেক্ষণ করা বৈশ্বিক তেল মজুত’ বলে, তা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এখন প্রায় ৫০ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল কমে গেছে। তবে এই হিসাবের মধ্যে চীনের মতো দেশগুলো নেই, যেসব দেশ নিজেদের তেল মজুতের তথ্য প্রকাশ করে না।

ডিজেল নিয়ে সমস্যা কোথায়

ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম নতুন নতুন রেকর্ড গড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে গাড়িচালকদের সংগঠন আমেরিকান অটোমোবাইলস অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, ডিজেলের গড় দাম এখন রেকর্ড প্রতি গ্যালন ৬ দশমিক ৫২ ডলার। ফ্রান্সে রোববার ডিজেলের গড় দাম রেকর্ড প্রতি লিটার ২ দশমিক ৪১ ইউরোতে উঠেছে। বার্তা সংস্থা এএফপির হিসাব অনুযায়ী, যা প্রতি গ্যালনে প্রায় ১০ দশমিক ৪০ ডলার।

নোবেল পুরস্কারজয়ী অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান সম্প্রতি এক পোস্টে লিখেছেন, ‘বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মূলত অপরিশোধিত তেলের সংকট নয়, বরং অপরিশোধিত তেল থেকে তৈরি পেট্রোলিয়াম পণ্যের সংকট।’ তাঁর মতে, এই সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ হলো বিশ্বজুড়ে তেল শোধনক্ষমতার ঘাটতি।

পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার বেশ কিছু তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাশিয়াও জ্বালানি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর ফলে রাশিয়ার অবশিষ্ট ক্রেতারা জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। এতে দাম আরও বেড়ে যাচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলোও পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের বড় রপ্তানিকারক। এদিকে ইরান ওই অঞ্চলের বিভিন্ন তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে। এর অর্থ হলো, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন এখনই স্বাভাবিক হয়ে গেলেও ডিজেলের বাজার কিছু সময়ের জন্য সংকটের মধ্যেই থাকবে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির ভাইস প্রেসিডেন্ট জানিভ শাহ বলেন, ‘সরবরাহে বিঘ্ন বৈশ্বিক হওয়ায় সব অঞ্চলেই ডিজেলের দাম বেড়েছে। তবে ইউরোপ বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে।’ এর কারণ, ইউরোপ ডিজেলের নেট আমদানিকারক।

সামনে কী কী বিকল্প আছে

স্বল্পমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলার সুযোগ খুব বেশি নেই। জানিভ শাহ বলেন, ‘প্রযুক্তিগতভাবে কাগজে-কলমে কিছু অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু খুব অল্প পরিমাণ ক্ষমতাই দ্রুত সক্রিয় করা সম্ভব। তার ওপর প্রয়োজনীয় ধরনের অপরিশোধিত তেলও দ্রুত সরবরাহ করা কঠিন।’ তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবার তেল পরিবহন শুরু হওয়াই দাম কমানোর সবচেয়ে দ্রুত উপায় হতে পারে। এতে এশিয়ার তেল শোধনাগারগুলো প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেল পেতে পারবে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তেল শিল্প ও বাজার বিভাগের প্রধান তোরিল বোসোনি গত সপ্তাহে সতর্ক করে বলেন, ‘আগামী কয়েক মাস উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেলের সরবরাহ সীমিত থাকলে এবং বাণিজ্যিক মজুত দ্রুত কমতে থাকলে সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান কমাতে আরও বেশি দাম এবং চাহিদা আরও কমে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।’

রিস্টাডের জানিভ শাহ বলেন, দাম বাড়লে ডিজেলের ব্যবহার কমাতে সহায়তা করবে। তবে এর প্রভাব সীমিত থাকবে। তিনি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদে ডিজেলের চাহিদা তুলনামূলকভাবে কম সংবেদনশীল। কারণ পণ্য পরিবহন, কৃষি, নির্মাণ ও শিল্প খাতে দ্রুত ব্যবহারযোগ্য বিকল্প খুব কম।’

ফলে যুদ্ধের কারণে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহে ধাক্কার পাশাপাশি তেল শোধনাগারের ক্ষতি এবং শোধনক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এখন জ্বালানি বাজারের সংকটকে আরও গভীর করছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া এবং শোধনাগারগুলোর সক্ষমতা পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত ডিজেলের বাজারে চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত