Ajker Patrika

কক্সবাজার সৈকত: বালিয়াড়ি নষ্ট করে সড়ক

  • সাগরপাড়ে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ পৌরসভার
  • প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা
  • পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেয়নি পৌর কর্তৃপক্ষ
মাইনউদ্দিন শাহেদ, কক্সবাজার
কক্সবাজার সৈকত: বালিয়াড়ি নষ্ট করে সড়ক
সাগরপাড় ঘেঁষে সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। সম্প্রতি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কলাতলী এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

কক্সবাজার শহরের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পর্যন্ত সাগরপাড় ঘেঁষে শুরু হয়েছে নতুন সড়ক নির্মাণের কাজ। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই বিদেশি অর্থায়নে বালিয়াড়িতে এ সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের জেলা কর্মকর্তা। তবে কক্সবাজার পৌরসভা কর্তৃপক্ষের দাবি, পরিবেশ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে।

সমুদ্রসৈকত এলাকায় সড়ক নির্মাণ হলে বালিয়াড়ি, সৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো।

তবে পৌরসভা কর্তৃপক্ষের দাবি, পর্যটনশিল্পের বিকাশ, শহরের যানজট কমানো এবং মেরিন ড্রাইভের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করতে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া পর্যটন ব্যবসায়ীরাও সড়ক নির্মাণের পক্ষে।

কক্সবাজার পৌরসভার কর্মকর্তা ও পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে পর্যটকের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের প্রধান সড়কগুলোতে যানজটও বেড়েছে। বিশেষ করে সুগন্ধা, লাবণী ও কলাতলী এলাকায় পর্যটন মৌসুমে যানবাহনের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে সাগরপাড়ের বিকল্প সড়কটি বাস্তবায়ন হলে শহরের অভ্যন্তরীণ সড়কে যানবাহনের চাপ কমবে বলে মনে করছে পৌর কর্তৃপক্ষ।

কক্সবাজার পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগের দেওয়া তথ্যমতে, স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আরবান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিটি গভর্ন্যান্স প্রজেক্ট (ইউডিসিজিপি)-এর অধীনে শহরের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী হোটেল সায়মন পর্যন্ত ১ দশমিক ২৮০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ২৮ মিটার প্রস্থ সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। চলতি বছরের ৫ মে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য কাজটি পায় ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স-এনডিই নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৮ সালের ৫ মে কাজটি সমাপ্ত করার কথা রয়েছে। এতে অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সুগন্ধা সৈকতের সি প্রিন্সেস হোটেলের সামনে থেকে দক্ষিণ দিকে সাগরপাড় ধরে ইট বিছানো ১০ ফুট চওডা একটি সড়ক গেছে কলাতলীর দিকে। ৩০০ থেকে ৩৫০ মিটার পর আর কোনো সড়কের অস্তিত্ব নেই। এরপর কলাতলী পর্যন্ত পুরোটাই বালিয়াড়ি।

এই বালিয়াড়ির ওপরই সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনডিইর প্রতিনিধি মোহাম্মদ শাহীন বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পরিবেশের সুরক্ষা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের বিষয়টি পৌর কর্তৃপক্ষ দেখবে। পাশাপাশি পৌর কর্তৃপক্ষ যেভাবে জায়গা বুঝিয়ে দিয়েছে, সেভাবে আমরা কাজ করছি।’

সড়কটি বাস্তবায়ন হলে সৈকতের ভাঙন ঠেকানো যাবে জানিয়ে কক্সবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রোমেল বড়ুয়া আজকের পত্রিকা বলেন, ‘সড়কটি মেরিন ড্রাইভের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। এর ফলে পর্যটনকেন্দ্রিক পরিবহনব্যবস্থায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’ একই সঙ্গে শহরের ভেতরের যানজট নিরসনে এটি বিকল্প রুট হিসেবে কাজ করবে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রকল্পটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অবশ্যই পরিবেশবাদীদের আপত্তি সড়কের অবস্থান ও উপকূলীয় পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে।

তারা বলছেন, প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) যেকোনো ধরনের অবকাঠামো নির্মাণে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পাশাপাশি সড়ক নির্মাণের বিকল্প জায়গা থাকার পরও বালিয়াড়িতে করার কারণে তাঁরা উদ্বিগ্ন। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে গত রোববার প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছে।

বাপার কক্সবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, সমুদ্রের বালিয়াড়ি শুধু সৈকতের সৌন্দর্যের অংশ নয়, এটি ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও শক্তিশালী ঢেউয়ের অভিঘাত থেকে স্থলভাগকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রাকৃতিক প্রতিরোধব্যবস্থা। এ ছাড়া সামুদ্রিক কচ্ছপসহ বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের আভাসস্থল এই বালিয়াড়ি। ফলে এসব প্রাকৃতিক কাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে দীর্ঘ মেয়াদে উপকূলের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

এ ছাড়া সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে সড়ক নির্মাণ করার অভিযোগে জেলা প্রশাসকসহ চারজনকে আদালত অবমাননার আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। গত বুধবার সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিসি) প্রেসিডেন্ট মনজিল মোরসেদ এই নোটিশ পাঠিয়েছেন। এতে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বালিয়াড়ির ওপর চলমান নির্মাণকাজ বন্ধের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

যাঁদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে তাঁরা হলেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান, প্রকল্প পরিচালক রাশিদুর রহমান, কক্সবাজার পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা আদনান চৌধুরী এবং জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি তাকাহাসকি জানকো।

সৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশ ঠিক রেখেই প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন। একই সঙ্গে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা নির্ধারণ হওয়াও জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় যেকোনো স্থাপনা কিংবা অবকাঠামো নির্মাণে পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সৈকততীরে সড়ক নির্মাণের জন্য কেউ ছাড়পত্র নেননি। এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী পরাক্রম চাকমা গতকাল সন্ধ্যায় আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় থেকে এ প্রকল্পের পরিবেশ ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি প্রকল্প পরিচালক অফিস থেকে দেখভাল করা হয়েছে। তারপরও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক ওঠায় আজ (গতকাল) থেকে আপাতত কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত