Ajker Patrika

সাব-রেজিস্ট্রারের অফিস

‘ঘুষে’ সংশোধন হয় জমি রেজিস্ট্রির নামের ভুল

  • ১০ লাখ টাকার নিচে দলিল নিবন্ধনে ঘুষ ১০ শতাংশ।
  • ১০ লাখ টাকার ওপরে দলিলে ৭ শতাংশ।
  • বিভিন্ন অজুহাতে হয়রানির বিস্তর অভিযোগ।
মাইনউদ্দিন শাহেদ, কক্সবাজার
‘ঘুষে’ সংশোধন হয় জমি রেজিস্ট্রির নামের ভুল
ছবি: আজকের পত্রিকা

কক্সবাজারের রামু উপজেলার মণ্ডলপাড়া গ্রামের শিক্ষক লোকমানুল হক সম্প্রতি তাঁর মামাতো ভাইয়ের জমি বিক্রয়ের নিবন্ধনে (রেজিস্ট্রির) সাক্ষী হয়েছিলেন। জমিদাতার খতিয়ানে বাবার নামে নাছিরের জায়গায় ‘নাদির’ লেখা ছিল। নামের এই ভুলের জন্য সাব-রেজিস্ট্রার আটকে দেন জমির নিবন্ধন। শেষমেশ জমিদাতাকে একটি শব্দ ভুলের জন্য ১৫ হাজার টাকা ‘ঘুষ’ দিয়ে জমিটি রেজিস্ট্রি করাতে হয়।

রামু উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে জমির দলিল নিবন্ধনে এ ধরনের ঘুষ নেওয়ার সাক্ষী শুধু এই শিক্ষক নন, প্রায় প্রতিদিন সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে এই কার্যালয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নানা ছুতায় ঘুষ নেওয়া এ কার্যালয়ে অনেকটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। সরকারি ফি পরিশোধের বাইরে ১০ লাখ টাকার বেশি মূল্যের দলিল নিবন্ধনে প্রতি লাখে ৭০০ এবং ১০ লাখ টাকার কম মূল্যের দলিলের ক্ষেত্রে প্রতি লাখে ১ হাজার টাকা করে ঘুষ দিতে হয়।

শুধু তা-ই নয়, সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য নানা অজুহাতে দলিল আটকে রাখা এবং নতুন নতুন শর্ত আরোপ করে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে সাব-রেজিস্ট্রার সাহেদ হোসেন চৌধুরী ও মোহরার নন্দরাম দাশের বিরুদ্ধে। গত বুধবার স্থানীয় কয়েক সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহে গেলে তাঁদের সামনেই খোরশেদ জুয়েল চৌধুরী ও সোয়েব সাঈদ নামের দুজন ভুক্তভোগীর তোপের মুখে পড়েন সাব-রেজিস্ট্রার।

জুয়েল চৌধুরী বলেন, ‘৫-৬ মাস আগে আমার দুই ভাগনের কাছ থেকে কেনা জমির নিবন্ধন করাতে যাই। তাঁদের বাবার জাতীয় পরিচয়পত্রে নামের হেরফের থাকায় নিবন্ধন আটকে দেওয়া হয়। পরে ‘ঘুষ’ নিয়ে দলিল নিবন্ধন করে দেন। এর আগে চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকেও জমি কেনার সময় নিবন্ধন আটকে দিয়ে এক লাখ টাকা ঘুষ আদায় করেন সাব-রেজিস্ট্রার ও মোহরার।

স্থানীয় সাংবাদিক সোয়েব সাঈদ বলেন, ‘কয়েক দিন আগে আমার গ্রামের এক অসহায় নারী তাঁর ছেলেকে দুই কড়া জমি দানপত্র করতে সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে এসেছিলেন। কিন্তু দলিলে আমাকে সাক্ষী করা হয়েছে দেখে নিবন্ধন আটকে দেন।’ মূলত ঘুষ নিতে পারবেন না মনে করে নিবন্ধন করে দেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

গত বুধ ও বৃহস্পতিবার রামু দলিল লেখক, সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় ও স্থানীয় ভুক্তভোগীসহ অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এসব ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলিল নিবন্ধনে দাতা-গ্রহীতা বা সম্পত্তির নামের সামান্য বানান ভুল, নামের সঙ্গে ‘প্রকাশ’ বা ‘ওরফে’ শব্দ যুক্ত থাকা কিংবা অন্যান্য ছোট বিষয়ের কারণ দেখিয়ে আটকে রেখে দেওয়া হয় নিবন্ধনপ্রক্রিয়া। পরক্ষণে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে একই দলিল নিবন্ধন করে দেওয়া হয়।

জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ১১ মাসে রামু সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে ৩ হাজার ৫৫৮টি দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে। এসব দলিলের বিপরীতে সরকার রাজস্ব পেয়েছে প্রায় ২১ কোটি টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, প্রায় দুই বছর ভিটে শ্রেণির জমির ক্ষেত্রে স্থাপনা দেখানো বাধ্যতামূলক করার নামে জমির মূল্যের পাশাপাশি ঘর বা স্থাপনার মূল্য হিসাব করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এ ছাড়া হেবা, দানপত্র, জীবনস্বত্ব দলিল এবং একাধিক দাগের জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও জটিলতা সৃষ্টি করে বাড়তি অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক দলিল লেখক অভিযোগ করেন, সাব-রেজিস্ট্রার মোটা অঙ্কের ঘুষ নেওয়ার জন্য নিজেই অনেক ফাঁদ তৈরি করেছেন। যেগুলো অন্যান্য অফিসে নেই। সপ্তাহে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তিনি রোববার ও বৃহস্পতিবার অফিস করেন না। এমনকি নিজ কর্মস্থলে বসবাসের নিয়ম থাকলেও তিনি প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় বসবাস করেন। সেখান থেকে সপ্তাহে তিন দিন অফিস করেন।

রামু উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাস্টার মো. আলম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণসহ এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হবে।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রামুর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের মোহরার নন্দরাম দাশ বলেন, ‘এসব অভিযোগ মিথ্যা। আমি কোনো দিন টাকা ধরি না। কাউকে টাকার কথাও বলি না।’

সাব-রেজিস্ট্রার সাহেদ হোসেন চৌধুরীও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, সেগুলো সুনির্দিষ্ট নয় এবং সত্যও না। ভুক্তভোগীরা কাকে টাকা দিয়েছেন, তা আমি জানি না।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা রেজিস্ট্রার মো. রেজাউল করিম বকসী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত