Ajker Patrika

কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি, ভেসে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র

কক্সবাজার ও চকরিয়া প্রতিনিধি
কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি, ভেসে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও অনেক স্থানে ঘরে ফিরতে পারেননি মানুষ। ছবি: আজকের পত্রিকা

গত রোববার রাতে থেকে বন্ধ হয়েছে বৃষ্টিপাত। এর আগে টানা ৮ দিন ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং সামুদ্রিক জোয়ারে কক্সবাজারে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে জেলার চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরি উপজেলার নিম্নাঞ্চলে এখনো পানি রয়েছে। রাস্তাঘাট ও উঁচু এলাকার বাড়ি-ঘরের পানি নেমে যাওয়ায় বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ভেসে উঠছে। বন্যাকবলিত এলাকায় পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত ৪ জুলাই থেকে প্রবল বৃষ্টিপাত শুরু হয়। এতে জেলার ১০ উপজেলায় বন্যা ও জলাবদ্ধতায় দেড় শতাধিক গ্রাম ৪ থেকে ৫ ফুট পানিতে তলিয়ে যায়। মাতামুহুরি ও বাঁকখালী নদীর দুই পাড়ের চকরিয়া, পেকুয়া, নবগঠিত মাতামুহুরি, রামু উপজেলার ৪০ ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গত ৫ জুলাই দিবাগত রাত থেকে রোববার রাত পর্যন্ত জেলায় পাহাড়ধস, ঢলের পানিতে ডুবে ও দেয়ালচাপায় ১৫ রোহিঙ্গাসহ অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ভেসে উঠছে ক্ষত চিহ্ন

গত ৪ থেকে ১২ জুলাই ৯ দিনে কক্সবাজারে ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে কক্সবাজারের ১০ উপজেলার ৭১টি ইউনিয়ন ও ৫ পৌরসভার ৪৯ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে পানিবন্দী ছিল অন্তত আড়াই লাখ মানুষ।

জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, পাহাড় ধস, পানিতে ভেসে রোহিঙ্গাসহ ৩১ জন নিহত হয়েছে। এই ৯ দিনে ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ির সংখ্যা ১ হাজার ৬১৩ টি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩০ টি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক, ৭৯ টি সেতু ও কালভার্ট।

জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য মতে, চকরিয়ার ১০ ইউনিয়ন ও ১ পৌরসভার ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এই উপজেলায় ৭ জনের প্রাণহানির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ির সংখ্যা ৩০০টি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক, ২০ সেতু ও কালভার্ট।

নবগঠিত মাতামুহুরি উপজেলার ৭ ইউনিয়নের ৮৫ শতাংশ এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়। এ উপজেলায় নিহত হয় একজন। ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ির সংখ্যা ১৯০টি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৯০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০ সেতু ও কালভার্ট।

পেকুয়া উপজেলার ৭ ইউনিয়ন ও ১ পৌরসভার ৯৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। এ উপজেলায় দুইজন নিহত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৪৫০টি বাড়িঘর, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১৫ টি, ২৩০ কিলোমিটার সড়ক ও ২টি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মহেশখালী উপজেলার ৮ ইউনিয়ন ও ১ পৌরসভার ৫০ শতাংশ প্লাবিত হয়ে প্রাণহানি হয় একজনের। এই উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ির সংখ্যা ২০০টি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১২০০ কিলোমিটার সড়ক ও ২টি সেতু।

রামু উপজেলার ১১ ইউনিয়নের ৩৫ শতাংশ প্লাবিত হয়ে প্রাণহানি হয় ২ জনের। এই উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ির সংখ্যা ২৫টি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫০ কিলোমিটার সড়ক ও ৫টি সেতু ও কালভার্ট।

এ ছাড়া কুতুবদিয়া, ঈদগাঁও, সদর, উখিয়া ও টেকনাফে বাড়ি-ঘর, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও খেতখামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানান, সরকার বন্যাদুর্গত এলাকার জন্য ৪৫০ টন চাল, ৩০ লাখ নগদ অর্থ ও শুকনো খাবার বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ৭৯০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ২৯৮ টন চাল ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। আরও ত্রাণের চাহিদা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, পাহাড়ি ঢল ও সৃষ্ট বন্যায় কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় বেড়িবাঁধের ৪০ জায়গায় ভেঙে গেছে। মাতামুহুরি উপজেলার কোনাখালীর একটি স্থানে ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। পানি কমে যাওয়ার পর এসব এলাকা জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে ৮৮টি মেডিকেল টিম

গত রোববার থেকে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। এর মধ্যে বন্যাকবলিত এলাকার বাসিন্দারা পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকে চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে ভিড় করছেন। সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের হার চকরিয়া, পেকুয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরি উপজেলায়।

চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা চিকিৎসক মিসকাত উদ্দীন আহমদ বলেন, বন্যার পানি নামার পর পানিবাহিত রোগ বাড়ছে। চুলকানি ও চর্মরোগও দেখা দিচ্ছে। এর মধ্যে হাসপাতালে কিছু ডায়রিয়ার রোগী ভর্তি আছে।

এ দিকে গতকাল সোমবার জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলায় ৮৮টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে ১৬টি এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ৭২টি টিম কাজ করবে।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় চিকিৎসাসেবা জোরদার করা হয়েছে জানিয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের আজকের পত্রিকাকে জানান, সম্ভাব্য পানিবাহিত ও সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সার্বক্ষণিক রোগ নজরদারি এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

তিনি জানান, বন্যা-পরবর্তী ডায়রিয়া, কলেরা, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগ বৃদ্ধির আশঙ্কায় জরুরি ওষুধের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখায় অতিরিক্ত বরাদ্দের জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত