Ajker Patrika

১৮-তে পা দিতেই শিশু পরিবার ছাড়ার নির্দেশ, দিশেহারা পাঁচ এতিম

দেবাশীষ দত্ত, কুষ্টিয়া 
১৮-তে পা দিতেই শিশু পরিবার ছাড়ার নির্দেশ, দিশেহারা পাঁচ এতিম
১৮ বছর পূর্ণ হওয়ায় শিশু পরিবার ছাড়ার নির্দেশ পেয়েছেন তাঁরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

এক বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর দাদা-দাদির কাছে বড় হয় আকাশ ইসলাম। মা ছেড়ে যাওয়ায় চার বছর বয়সে ২০০৭ সালের অক্টোবরে ফুফু তাঁকে কুষ্টিয়া শিশু পরিবারে ভর্তি করে দেন। ২০২১ সালে এসএসসি ও ২০২৩ সালে এইচএসসি পাস করে এখন তিনি কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে স্নাতক প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত। আগামী ২৭ জুলাই থেকে শুরু হবে প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা।

কিন্তু ১৮ বছরের বেশি বয়স হওয়ায় এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠান ছাড়ার নির্দেশ পেয়েছেন আকাশ। গতকাল সোমবারই তাঁকে শিশু পরিবার ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে। চোখে-মুখে এখন তাঁর চিন্তার ছাপ। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। দাদা মারা গেছেন। দাদি জীবিত, কিন্তু অসুস্থ। বেশির ভাগ ফুফু বাড়ি থাকেন। তিনিও এখন সেখানেই উঠবেন।

আকাশ ইসলাম কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পশ্চিম লাহিনীপাড়ার মৃত শহিদুল ইসলামের ছেলে।

জীবনের গল্পটা এক না হলেও অনেকটাই কাছাকাছি শিশু পরিবারে বেড়ে ওঠা একই এলাকার আকাশ শেখেরও। ২০১১ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর দারিদ্র্যের কারণে তাঁকে এক দূর সম্পর্কের নানা শিশু পরিবারে রেখে যান। তিনি ২০২১ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৪.৮৯ এবং ২০২৩ সালে এইচএসসিতে জিপিএ-৪.০০ পেয়ে বর্তমানে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগে স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়ছেন। আগামী ২৭ জুলাই তাঁরও প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হবে। পরীক্ষার ঠিক আগে কোথায় যাবেন, কীভাবে পড়াশোনা চালিয়ে নেবেন—তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন আকাশ শেখ। ইতিমধ্যে পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন। সংসারে মা ও বড় ভাই আছেন। ভাই ভাঙ্গারি ব্যবসা করে কোনো রকমে সংসার চালান। তিনিও ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন।

এই দু’জনের মতো শিশু পরিবারে বেড়ে ওঠা তুষার আহাম্মেদ, আলফাজ হোসেন ও অভি হাসানের বয়সও ১৮ বছর পার হয়েছে। তাঁরাও এখন প্রতিষ্ঠান ছাড়ার নির্দেশ পেয়েছেন। অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়ে, পারিবারিক দারিদ্র্য, স্বজনদের অক্ষমতা কিংবা মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের মতো নানা কারণে তাঁরা সরকারি শিশু পরিবারে আশ্রয় পান। পাঁচ-ছয় বছর বয়স থেকে সেখানে থেকেই তাঁরা পড়াশোনা চালিয়ে আসছেন।

১৮-তে পা দেওয়ার পরই আশ্রয় হারানোর শঙ্কায় দিশেহারা পাঁচ শিক্ষার্থী। সামনে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা থাকায় অন্তত পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিশু পরিবারে থাকার সুযোগ চেয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করারও দাবি জানিয়েছেন।

তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন আলফাজ হোসেন। তাঁর সঙ্গে কথা হলে বলেন, বাবার মৃত্যুর পর মা অন্যত্র বিয়ে করেন। এরপর ২০১২ সালে শিশু পরিবারে আমাকে ভর্তি করা হয়। অর্থের অভাবে এক বছর কলেজে ভর্তি হতে না পারলেও বর্তমানে এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ছি। আমার থাকার মতো স্থায়ী কোনো জায়গা নেই। অন্তত এইচএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত এখানে থাকতে পারলে পড়াশোনা শেষ করতে পারব। হাত-পা ধরেও কাজ হয়নি। এখন কী করব, কোথায় যাব, বুঝতে পারছি না।

তুষার আহাম্মেদের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, সাত বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে শিশু পরিবারে আশ্রয় পাই। বর্তমানে এইচএসসিতে অধ্যয়নরত। উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রস্তুতি নিতে চান। কিন্তু এখন আশ্রয় হারানোর শঙ্কায় সেই স্বপ্ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এখন প্রতিষ্ঠান ছাড়তে হলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে জানান তিনি।

অভি হাসানও একই ধরনের সমস্যার কথা তুলে ধরে বলেন, নিরাপদ আশ্রয় না থাকলে তাঁর পক্ষে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ১৮ বছর পূর্ণ হলেই একজন এতিম বা অসহায় তরুণ স্বাবলম্বী হয়ে যায় না। পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই আশ্রয় হারালে তাদের শিক্ষা ও কর্মজীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে অন্তত চলমান পড়াশোনা ও পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিশু পরিবারে থাকার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আব্দুল লতিফ আজকের পত্রিকাকে বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী ১৮ বছর পর্যন্ত তাঁদের লালন-পালনের দায়িত্ব থাকে। তাই তাঁদের শিশু পরিবার (বালক) ছাড়তে হবে। এর বাইরে আমাদের করণীয় খুবই সীমিত। তবে তাঁরা যদি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান, তাহলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে শিক্ষাবৃত্তিসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে। এই পাঁচজনের বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছি। সাময়িকভাবে যাতে সমস্যায় না পড়ে এ জন্য আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। যদি কর্মসংস্থানের জন্যও সহযোগিতা করা হবে।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বিষয়টি আমি জেনেছি। তাঁদের কতটুকু সহযোগিতা করা যায় সে বিষয়ে কাজ করছি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত