Ajker Patrika

উদ্বোধনের ফিতায় বন্দী ১৫ লাখ টাকার তাঁত প্রকল্প

ইউসুফ আরফাত, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম)
উদ্বোধনের ফিতায় বন্দী ১৫ লাখ টাকার তাঁত প্রকল্প
বালিধন ত্রিপুরাপাড়ায় ছয় বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে আটটি তাঁত মেশিন। ছবি: আজকের পত্রিকা

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ভূজপুর ইউনিয়নের খৈয়াছড়া চা-বাগানসংলগ্ন বালিধন ত্রিপুরাপাড়ায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে স্থাপন করা হয়েছিল একটি সরকারি তাঁত ও কাপড় উৎপাদন প্রকল্প। প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পটি উদ্বোধনের পরই অচল হয়ে পড়ে। ছয় বছরের বেশি সময় ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা মেশিনগুলো এখন মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে। পরিকল্পনাহীনতা, প্রশাসনিক দায়সারা মনোভাব এবং জবাবদিহির অভাবে প্রকল্পটি এখন সরকারি অর্থ অপচয়ের নগ্ন উদাহরণ হয়ে আছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, একটি টিনশেড ঘরের ভেতরে সারবদ্ধভাবে পড়ে আছে আটটি তাঁত ও কাপড় তৈরির ভারী মেশিন। কোথাও জমেছে ধুলার স্তর, কোথাও ধরেছে মরিচা। একটি মেশিনে এখনো অর্ধেক তৈরি কাপড় আটকে রয়েছে। তবে সেখানে উৎপাদন কার্যক্রম বা শ্রমিকের কোনো উপস্থিতি নেই।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, উদ্বোধনের দিন কিছু সময়ের জন্য মেশিন চালানো হলেও পরে আর কখনো এখানে কোনো কাজ হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা হৃদয় ত্রিপুরাসহ অনেকে জানান, প্রকল্প চালুর সময় কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ ও স্বাবলম্বী জীবনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে প্রশিক্ষণ তো দূরের কথা, কোনো লোকজনই আসেনি। ফলে শুরু হওয়ার আগেই প্রকল্পটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ বরাদ্দ থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উন্নয়নের অংশ হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। উদ্বোধন করেন তৎকালীন সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য খাদিজাতুল আনোয়ার সনি। সে সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ছিলেন মো. সায়েদুল আরেফিন।

বর্তমানে দিয়ারা অপারেশনের সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সাবেক ইউএনও মো. সায়েদুল আরেফিন বলেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। পরিচালনার জন্য স্থানীয়ভাবে একটি কমিটিও করা হয়েছিল। ২০২০ সালে প্রকল্পটি উদ্বোধন করা হয়। তবে করোনা মহামারির কারণে প্রকল্পটির কার্যক্রম আর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তবে অনুসন্ধানে আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। প্রায় দুই মাস চেষ্টা করেও প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক নাম, ব্যয় বিবরণী, প্রকল্প প্রস্তাব বা কোন সরকারি দপ্তরের অধীনে এটি বাস্তবায়িত হয়েছিল, তার কোনো নথি পাওয়া যায়নি। এমনকি বর্তমান উপজেলা প্রশাসনের কাছেও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী দপ্তরের সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।

ভূজপুর ইউনিয়ন পরিষদে খোঁজ নিতে গেলে চেয়ারম্যানের মাধ্যমে উঠে আসে ফুল কুমারের নাম। পরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রকল্পটি শুরু থেকেই পরিকল্পনাহীন ছিল। এটি মূলত উদ্বোধন দেখানোর জন্যই করা হয়েছিল। বাস্তবায়নের আগে ছিল না কোনো চাহিদা যাচাই, দক্ষতা উন্নয়ন কিংবা বাজার সংযোগের পরিকল্পনা। ফলে যাঁদের জন্য প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, সেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ কোনো সুফল পাননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, এখানে শুধু ফিতা কাটা হয়েছে। এরপর আর কেউ ফিরে তাকায়নি। এখন লাখ লাখ টাকার মেশিন নষ্ট হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্পটি এখনো সচল করা সম্ভব। এতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জন্য টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, অতিরিক্ত বরাদ্দ এনে প্রকল্পটি সচল করা যায় কি না, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত