Ajker Patrika

গলার কাঁটা কর্ণফুলী টানেল

  • দৈনিক ২৮ হাজার যানবাহন চলাচলের অনুমান করা হলেও চলছে মাত্র ৩ থেকে ৪ হাজার
  • প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার লোকসান
  • ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৭০টি রেস্টহাউস ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ
 আবু বকর ছিদ্দিক, চট্টগ্রাম
আপডেট : ০২ জুন ২০২৬, ০৮: ০৫
গলার কাঁটা কর্ণফুলী টানেল
কর্ণফুলী টানেল। ছবি: আজকের পত্রিকা

দৈনিক প্রায় ২৮ হাজার যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাসে নির্মিত কর্ণফুলী টানেলে এখন চলাচল করছে মাত্র তিন থেকে চার হাজার যানবাহন। ফলে টোলের আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানো যাচ্ছে না, প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার লোকসান। আর্থিক ক্ষতি কমাতে এবার টানেলের দক্ষিণ প্রান্তে ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৭০টি রেস্টহাউস বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আওয়ামী সরকারের আমলে নির্মিত টানেল সরকারের কাছে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্পের আয় থেকে দায় শোধ হচ্ছে না। উল্টো প্রতিদিন গচ্চা যাচ্ছে ১২ লাখ টাকা। আগে এর পরিমাণ আরও বেশি ছিল। নানাভাবে ব্যয় কমিয়েও আয় থেকে দায় শোধ করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া বছর শেষে ঋণের কিস্তি পরিশোধও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর্থিক ক্ষতি কমাতে এবার টানেলের দক্ষিণ প্রান্তে ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৭০টি রেস্টহাউস (সার্ভিস এরিয়া) ইজারা দেওয়া হচ্ছে।

দক্ষিণ-পূর্ব চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল। এর উত্তর প্রান্ত পতেঙ্গায়; চট্টগ্রাম বন্দর ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি। টানেলটির দক্ষিণ প্রান্ত আনোয়ারা উপজেলায়। চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে পতেঙ্গা ও আনোয়ারা উপজেলাকে যুক্ত করেছে এই টানেল।

এক-চতুর্থাংশের কম যান চলাচল

তথ্যমতে, টানেলটির নির্মাণ ব্যয় প্রায় ১০ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে উদ্বোধনের পর টানেলটি দিয়ে এখন প্রতিদিন গড়ে ৪ হাজারের কম যানবাহন চলাচল করে, যা টানেল উদ্বোধনের আগে করা সমীক্ষার ৪ ভাগের ১ ভাগের কম। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, এই টানেলের দৈনিক পরিচালন ব্যয় ২২ থেকে ২৪ লাখ টাকা, যেখানে টোল থেকে আয় হয় মাত্র ১০ থেকে ১৪ লাখ টাকা। ফলে প্রতিদিন গড়ে ১০ লাখ টাকার বেশি লোকসান দিচ্ছে সরকার। তথ্যমতে, ২০১৩ সালে চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি) পরিচালিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় কর্ণফুলী টানেল ২০১৭ সালে চালু হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। সেই সঙ্গে প্রাক্কলন করা হয়েছিল, প্রথম বছরে টানেল দিয়ে দৈনিক গড়ে ১৭ হাজার ৩৭৪টি যানবাহন চলাচল করবে। এই সংখ্যা ২০২০ সালে বেড়ে ২০ হাজার ৭১৯ এবং ২০২৫ সালে ২৮ হাজার ৩০৫-এ পৌঁছাবে।

টানেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সৈয়দ রজব আলী বলেন, ‘সারা দেশের সেতু বিভাগের বড় অবকাঠামোগুলো একাধিক জেলাকে সংযোগ করেছে। কিন্তু টানেলের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন।’

রজব আলী বলেন, ‘টানেলকে ঘিরে সড়ক অবকাঠামো, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তি আশানুরূপ হয়নি। শুরুতে যানবাহন চলাচল কম হলেও ধারাবাহিকভাবে এ সংখ্যা বাড়বে, এতে সন্দেহ নেই।’

সেতু বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছর ঈদুল ফিতরের আগে ১২ মার্চ টানেল দিয়ে ২ হাজার ৯৩৯টি যানবাহন চলাচল করে। ১৩ মার্চ এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২০৭, ১৪ মার্চ ২ হাজার ৯৬৯ ও ১৫ মার্চ ৩ হাজার ৩৫২। ঈদুল ফিতরের আগে ১৬ মার্চ টানেল দিয়ে ৩ হাজার ৪৫৬টি যানবাহন চলাচল করে। ১৭ মার্চ এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২৪৯, ১৮ মার্চ ৩ হাজার ৮১৯ ও ১৯ মার্চ ৩ হাজার ১১০। ২০২২ সালের ১৮ নভেম্বর টানেল রক্ষণাবেক্ষণ ও টোল আদায়ের লক্ষ্যে সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে টানেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে নিয়োগ দেয় সরকার। প্রতিবছর টানেল পরিচালনায় সেতু বিভাগের ব্যয় ১৯৭ কোটি টাকা। ব্যয়ের হার বেশি হওয়ায় লোকসান কমিয়ে আনতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সেতু বিভাগ।

সূত্র জানায়, আগে প্রতিদিন ৩৭ লাখ টাকার বেশি পরিচালন ব্যয় হলেও দেড় বছর ধরে ব্যয় কমিয়ে দৈনিক ২০-২২ লাখ টাকায় নামিয়ে এনেছে। ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল রেস্টহাউস বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ওই রেস্টহাউসে রয়েছে ৩০টি তিন রুমের বাংলো, ৪০টি ডরমিটরি রুম এবং একটি ভিভিআইপি বাংলো।

সৈয়দ রজব আলী বলেন, ‘কর্ণফুলী টানেল সার্ভিস এরিয়া রিসোর্টটি আমরা বেসরকারি খাতে দেওয়ার পরিকল্পনা করছি। আগামী ১৬ জুন দরপত্র আহ্বান করা হবে। এসব বাংলো পর্যটন ব্যবসায় যুক্ত তিন থেকে পাঁচ তারকা হোটেলের অভিজ্ঞতা আছে, এমন কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হলে সরকারের লোকসান কমে আসবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত