Ajker Patrika

ওমানে ৪ ভাইয়ের মৃত্যু: মাকে বাঁচাতে ফটকে তালা একমাত্র জীবিত ছেলের

সবুর শুভ, চট্টগ্রাম    
ওমানে ৪ ভাইয়ের মৃত্যু: মাকে বাঁচাতে ফটকে তালা একমাত্র জীবিত ছেলের
ওমানে গাড়ির ভেতর মারা যাওয়া চার ভাই। ছবি: সংগৃহীত

ওমানে গাড়ির ভেতরে মারা যাওয়া চার সন্তানের করুণ পরিণতি সম্পর্কে এখনো জানেন না তাঁদের মা খাদিজা বেগম। বয়সের ভার ও রোগে এমনিতেই বেশ কাবু তিনি। স্বামীহীন সংসারের ঘানি টানতে টানতে ক্লান্তও। মারা যাওয়া চার ছেলেসহ পাঁচ ছেলেকে ছোট রেখেই মারা যান তাঁদের বাবা জামাল উদ্দিন। অনেক কষ্টে ছেলেদের বড় করে বিদেশে পাঠান মা খাদিজা। ছেলেরা বেশ টাকাপয়সা উপার্জন করে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার লালানগর ইউনিয়নে জায়গা কিনে পাকা বাড়ি করেন। চট্টগ্রাম শহরে জায়গা কিংবা ফ্ল্যাট কেনার কথাবার্তাও হচ্ছিল পরিবারের সদস্যদের মধ্যে।

মারা যাওয়া চারজনের মধ্যে ছোট দুই ভাইয়ের বিয়ের কথাও হচ্ছিল সম্প্রতি। ১৫ মে ছোট দুই ভাইয়ের দেশের আসার কথা ছিল। কিন্তু ১৩ মে ওমানে ঘটা নজিরবিহীন দুর্ঘটনায় একসঙ্গে চার ভাই লাশ হয়ে গেলেন।

তবে আগামী মঙ্গলবার চার ভাই দেশে আসবেন নিথর দেহে কফিনে বন্দী হয়ে। আনন্দের জায়গায় সীমাহীন বেদনার এক গল্প হয়ে আসবেন চার ভাই। লাশের অপেক্ষায় আত্মীয়স্বজনসহ রাঙ্গুনিয়ার লালানগর ইউনিয়নের বাসিন্দারা।

অসুস্থ মাকে এখনো জানানো হয়নি চার ছেলের পরিণতি সম্পর্কে। মা খাদিজা বেগম শুধু জানেন, তাঁর এক ছেলে অসুস্থ হয়ে ওমানে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। ভাইয়ের চিকিৎসার কারণে অন্য ভাইয়েরাও আসতে পারছেন না। তবে যেকোনো সময় তাঁর কলিজার ধনেরা হাজির হয়ে বলবেন, ‘মা, আমরা এসেছি’। এই বিশ্বাস এখনো খাদিজার।

মাকে না জানানোর কারণ হিসেবে দেশে থাকা একমাত্র জীবিত ভাই মো. এনাম জানান, ভাইদের মৃত্যুর খবর শুনলে মাকে বাঁচাতে পারব না। এমনিতে মা খুব অসুস্থ।

আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীরা কেউ এই খবর যেন খাদিজা বেগমকে জানাতে না পারেন, এ জন্য ফটকে তালা দিয়ে রেখেছেন এনাম। তিনি রাঙ্গুনিয়ায় মায়ের সঙ্গেই থাকেন।

সেদিন কী ঘটেছিল

১৩ মে সন্ধ্যায় চার ভাই ওমানের বারকা এলাকা থেকে মুলাদ্দাহর উদ্দেশে রওনা হন। রাত ৮টার পর তাঁদের একজন এক আত্মীয়কে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে অসুস্থতার কথা বলেন। নিজেদের লোকেশন পাঠিয়ে বলেন, গাড়ি থেকে বের হওয়ার মতো অবস্থাও তাঁদের নেই। তাঁদের নাকেমুখে ফেনা আসছে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মায়ের কাছে ফোন করেও তাঁরা দোয়া চান বলে জানা গেছে। কিছুক্ষণ পর একটি ক্লিনিকের সামনে পার্ক করা গাড়ির ভেতরে চারজনকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গাড়ির দরজা খুলে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করে। নিহত চার ভাই হলেন রাশেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম।

তাঁদের কোনো বোন নেই। রাশেদুলের স্ত্রী ও দুই সন্তান রয়েছে। আর শাহেদুলের স্ত্রী ও এক সন্তান। সিরাজুল ও শহিদুল অবিবাহিত ছিলেন।

চার ভাই কেন এক গাড়িতে

ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় অসুস্থ বড় ভাই রাশেদুল ইসলামকে ডাক্তার দেখাতে ক্লিনিকে নিয়ে গিয়েছিলেন বাকি তিন ভাই শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম। চিকিৎসকের সিরিয়াল পেতে দেরি হওয়ায় তাঁরা গাড়ির ভেতর এসি চালিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাড়ির এসি থেকে নির্গত বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস নিশ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করায় ওই অবস্থাতেই চার ভাইয়ের মৃত্যু হয়।

কী বলছে ওমান পুলিশ

রয়্যাল ওমান পুলিশের বরাত দিয়ে টাইমস অব ওমানের খবরে বলা হয়েছে, গাড়ি চালু থাকা অবস্থায় এসির এগজস্ট থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে শ্বাস গ্রহণের ফলে ওই চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনার পর আবদ্ধ গাড়িতে ঘুমানোর ব্যাপারে সতর্কতা জারি করেছে পুলিশ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত