Ajker Patrika

আর্জেন্টিনার জার্সি পরে রাতে আনন্দ-উল্লাস, সকালে পাহাড় ধসে নিহত সামিয়া

সোহেল মারমা, চট্টগ্রাম 
আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৬, ২২: ১১
আর্জেন্টিনার জার্সি পরে রাতে আনন্দ-উল্লাস, সকালে পাহাড় ধসে নিহত সামিয়া
নগরীর ষোলশহর চশমা পাহাড় এলাকায় পাহাড় ধসে নিহত সামিয়ার লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

দিনমজুর বাবা ও গৃহকর্মী মায়ের সঙ্গে পাহাড়ের পাদদেশে কলোনির টিনের ঘরে থাকত পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিয়া (১২)। দরিদ্র পরিবারের হলেও অনেকের মতো তাকেও ছুঁয়েছিল বিশ্বকাপ ফুটবলের জোয়ার। পছন্দের দল আর্জেন্টিনার জার্সি বেশির ভাগ সময় তার গায়ে থাকত। গতকাল মঙ্গলবার রাতেও আর্জেন্টিনার বিজয়ে সে ঘরে উল্লাস করেছিল। কিন্তু সেই উল্লাসই পরদিন সকালে শোকে ভেসেছে। পাহাড় ধসে চাপা পড়ে ঘরের ভেতরে মারা যায় সামিয়া। কাদামাটি ও টিনের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে যখন তাকে উদ্ধার করা হয়, সে সময়েও তার শরীরে ছিল কাদামাটিমাখা প্রিয় দলের সেই জার্সি।

আজ বুধবার বেলা ১১টায় নগরের পাঁচলাইশ থানাধীন মেয়র গলির বাবু কলোনির একটি টিনের ঘরের ওপর পাহাড় ধসে পড়ে। সেখানেই চাপা পড়ে মারা যায় সামিয়া। নিহত সামিয়া ওই কলোনির ভাড়াটে মোহাম্মদ ফারুক ও শিরিণের মেয়ে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট সামিয়া। সে স্থানীয় একটি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক শাহ ইমরান বলেন, `দুপুর ১২টা ৪৮ মিনিটে পাহাড়ধসের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। দুর্ঘটনার সময় ঘরে থাকা সামিয়ার বাবা বের হয়ে যেতে সক্ষম হলেও পাশের কক্ষে থাকা সামিয়া বের হতে পারেনি। পরে সোয়া ১টায় কাদামাটি ও ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। এরপর তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।'

পাঁচলাইশ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রিয়াজুল সালেহীন জানান, কলোনিতে পাহাড়ের পাদদেশে ছয়টি ঘর ছিল। এগুলোর মধ্যে ৩ ও ৪ নম্বর ঘরের ওপর পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ে। এ সময় ৩ নম্বর ঘরে থাকা সামিয়ার মৃত্যু হয়।

একই কলোনির পাশের ঘরের ভাড়াটে ঝর্না আক্তার আজকের পত্রিকাকে বলেন, `প্রিয় দল হওয়ায় মেয়েটা সব সময় আর্জেন্টিনার জার্সি পরে থাকত। তাদের বাসায় টিভি নেই। মঙ্গলবার রাতে মোবাইলে আর্জেন্টিনার খেলা দেখেছিল। আর্জেন্টিনার জয়ের পর সে রাতে আনন্দ-উল্লাসও করেছিল। সকালে হঠাৎ পাশে একটি বিকট শব্দে আওয়াজ শুনে বাইরে দেখি, পাশের ঘরের ওপর পাহাড় ধসে পড়েছে। এরপর ফায়ার সার্ভিসসহ সবাই মিলে টিন ও কাদামাটি সরিয়ে তার নিচ থেকে সামিয়াকে উদ্ধার করি।'

সামিয়ার মা শিরিণ বলেন, `অনেকে বলেছিল, এখানে পাহাড় ধস হবে না। তাই সরে যাইনি। আমাদের ভুল হয়েছে। যদি চলে যেতাম, তাহলে মেয়েটাকে এভাবে হারাতাম না।'

ফায়ার সার্ভিসের স্বেচ্ছাসেবক সুমাইয়া আক্তার আজকের পত্রিকাকে বলেন, `এই কলোনিতে ৬টি পরিবার বাস করছে। কিন্তু পাহাড়ের পাদদেশে থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তিন দিন ধরে আমরা তাদের সরে যেতে মাইকিং করছি। ওনাদের জন্য হোসনাবাদ উচ্চবিদ্যালয়ে একটি আশ্রয়কেন্দ্রও খোলা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি পরিবার আমাদের আশ্রয়কেন্দ্র হোসনাবাদ উচ্চবিদ্যালয়ের উঠেছে। বাকি ৪টি পরিবার সরেনি। এর মধ্যে সকালে এই পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে।'

বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপের কারণে গত শনিবার থেকে চট্টগ্রামে থেমে থেমে ভারী ও অতিভারী বৃষ্টি হচ্ছে। বুধবারও দিনভর বৃষ্টি ছিল। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস কয়েক দিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় চট্টগ্রামে ভূমিধসের আশঙ্কা নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে আসছিল। জেলা প্রশাসনও গত রোববার থেকে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে নগরের বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের জন্য বিভিন্ন স্কুলে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

এসব উদ্যোগ ও সতর্কবার্তার পরও নগরের বিভিন্ন এলাকায় এখনো পাহাড়ের পাদদেশে লোকজন বসবাস করছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত