Ajker Patrika

জনবল-ওষুধ-বিদ্যুৎহীন স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিজেই অসুস্থ, বাড়ছে মা ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি

গাজী মমিন, ফরিদগঞ্জ (চাঁদপুর) 
জনবল-ওষুধ-বিদ্যুৎহীন স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিজেই অসুস্থ, বাড়ছে মা ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি
লাউতলী গ্রামে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি যেন পরিত্যক্ত এক ভুতুড়ে বাড়ি। ছবি: আজকের পত্রিকা

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার গুপ্টি পশ্চিম ইউনিয়নের লাউতলী গ্রামে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি প্রায় ২৫ হাজার দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবার একমাত্র ভরসা হলেও বর্তমানে তা নামেই স্বাস্থ্যকেন্দ্র। স্থানীয় জনগণ এখান থেকে তেমন কোনো স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না। তিন বছর ধরে কেন্দ্রটিতে নেই জনবল, ওষুধ ও বিদ্যুৎ-সংযোগ। এই সুযোগে চুরি হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ আসবাব। রাতের আঁধারে পরিত্যক্ত ভবনটিতে জমে ওঠে মাদকসেবীদের আড্ডা। ফলে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত স্থানীয় দরিদ্র মানুষ, বাড়ছে মা ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি।

প্রান্তিক পর্যায়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকারের উদ্যোগ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় ২০০৫ সালে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি চালু হয়েছিল। তিন বছর ধরে ওষুধ ও জনবল-সংকটে বন্ধ রয়েছে নরমাল ডেলিভারি, প্রসূতি সেবা, কিশোর-কিশোরী স্বাস্থ্যসেবা ও সাধারণ চিকিৎসাসেবা। ফলে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে দরিদ্র মানুষ গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তারদের শরণাপন্ন হচ্ছে।

এ কেন্দ্রে একজন মেডিকেল অফিসার, একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, একজন ফার্মাসিস্ট ও একজন পিয়নের পদ থাকলেও বর্তমানে সেখানে কেউ আসেন না। জনবলের পাশাপাশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকায় দরজা ভেঙে চুরি হয়েছে বৈদ্যুতিক পাখা, পানির মোটরসহ গুরুত্বপূর্ণ আসবাব। শৌচাগার ব্যবহারের অনুপযোগী, নেই পানির ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি যেন নিজেই অসুস্থ হয়ে ধুঁকছে। এখানে সেবা নিতে আসা রোগীদের অভিযোগ আর আক্ষেপের শেষ নেই।

স্থানীয় বাসিন্দা বশির উল্যা মিজি (১০৫) বলেন, ‘আমাদের অনেক ত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গড়ে উঠেছিল। কিন্তু কয়েক বছর ধরে এখানে ডাক্তার-ওষুধ কিছুই নেই। সেবা না পেয়ে সাধারণ মানুষের অনেক ভোগান্তি হচ্ছে। দ্রুত ওষুধ ও ডাক্তার দেওয়া জরুরি।’

সেবাপ্রার্থী ফিরোজা বেগম (৬০), আমিন উল্যাহ (৫৫), সিরাজুল ইসলামসহ (৫৭) আরও কয়েকজন জানান, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে নানা রোগ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভুগছেন। এই হাসপাতালে চিকিৎসক, ওষুধ কিছুই নেই। জরুরি চিকিৎসার জন্য ভাঙাচোরা সড়ক পেরিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে উপজেলা হাসপাতালে যেতে হয়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাঁদের।

আজগর আলী (৭০) নামের এক বৃদ্ধ বলেন, ‘আমরা উপজেলা থেকে দূরে গ্রামগঞ্জের মানুষ হওয়ায় যেন বড় পাপ করে ফেলেছি। রাষ্ট্রের নাগরিক সেবার অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত। আমাদের ইউনিয়ন পারিবারিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র খাতা-কলমে আছে, কিন্তু সেবার ক্ষেত্রে শূন্য। এটি এখন চুরি ও মাদকের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। হাসপাতাল নিজেই অসুস্থ, সেবা দেবে কে?’

স্থানীয় ইউনিয়নের পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক মো. মেহেদী হাসান বলেন, ‘এ কেন্দ্রের বর্তমান পরিস্থিতি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি। জনবল ও ওষুধের সংকট রয়েছে। এগুলো পেলে কিছুটা হলেও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।’

লাউতলী গ্রামে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি যেন পরিত্যক্ত এক ভুতুড়ে বাড়ি। ছবি: আজকের পত্রিকা
লাউতলী গ্রামে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি যেন পরিত্যক্ত এক ভুতুড়ে বাড়ি। ছবি: আজকের পত্রিকা

ফরিদগঞ্জ থানার উপপুলিশ পরিদর্শক (এসআই) জাকির হোসেন বলেন, হাসপাতালটিতে চুরির ঘটনায় পরিদর্শন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সত্যতা পাওয়া গেছে। চোর চক্র ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বুলবুল আহমেদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ। স্থানীয় মাদকসেবী ও চোর চক্র ইতিমধ্যে অনেক কিছু লুট করেছে। চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে সাধারণ মানুষ, মা ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে। দ্রুত এই কেন্দ্র সচল করা প্রয়োজন। বিষয়টি আমি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে জানিয়েছি।’

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান জুয়েল বলেন, ‘লাউতলী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পরিস্থিতি শুনে খারাপ লেগেছে। বিষয়টি স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার বিভাগের এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর দেখে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করব। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পক্ষ থেকে সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত