Ajker Patrika

হবিগঞ্জের সুতাং নদ: মাছে প্লাস্টিক, পানিতে ভারী ধাতু

  • গড়ে দুটি প্লাস্টিক কণা পাওয়া যাচ্ছে মাছের পেটে।
  • প্রতি লিটার পানিতে ৪৬টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত।
  • মাছের পেটে পলিথিন, পলিইথিলিন টেরেফথালেট, কৃত্রিম পলিআমাইড।
  • পানিতে লোহা, ম্যাঙ্গানিজ ও সিসার উপস্থিতি।
  • কণার আকার: ০.১ থেকে ০.৫ মিলিমিটার পর্যন্ত।
  • দীর্ঘ মেয়াদে ক্যানসার, স্নায়ুরোগসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি স্থানীয়দের।
সহিবুর রহমান, হবিগঞ্জ 
আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৭: ১৮
হবিগঞ্জের সুতাং নদ: মাছে প্লাস্টিক, পানিতে ভারী ধাতু
কারখানার বর্জ্যে কালো কুচকুচে রং ধারণ করেছে সুতাং নদের পানি। একসময় যোগাযোগ ও জীবিকার প্রধান উৎস হলেও এখন এটি মৃতপ্রায়। সম্প্রতি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ভাদগরি গ্রামে। ছবি: আজকের পত্রিকা

হবিগঞ্জের সুতাং নদ ভয়াবহ পরিবেশদূষণের কবলে পড়েছে। এই নদ থেকে সংগৃহীত ৩০টি মাছের পরিপাকতন্ত্র বিশ্লেষণ করে মোট ৫১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি মাছে গড়ে প্রায় দুটি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। সুতাংয়ের পানিতেও পাওয়া গেছে বিপুল ক্ষুদ্র প্লাস্টিক ও ভারী ধাতব কণা।

হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হকৃবি) সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে। এতে আরও বলা হয়, ছোট মাছের তুলনায় বড় আকারের মাছে দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি। দীর্ঘদিন এই নদে তাদের বসবাসে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

পানিতে দূষিত প্লাস্টিক: নদের পানিতেও পাওয়া গেছে বিপুল ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। প্রতি লিটার পানিতে ৬টি থেকে সর্বোচ্চ ৪৬টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এসব কণার গড় আকার শূন্য দশমিক ১ মিলিমিটার থেকে শূন্য দশমিক ৫ মিলিমিটার পর্যন্ত। রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব কণার মধ্যে পলিথিন, পলিইথিলিন টেরেফথালেট ও পলিআমাইডের মতো ক্ষতিকর প্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এসব কণা এসেছে শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিক প্যাকেটজাত পণ্য থেকে।

সুতাং নদের পানি নিয়ে আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, এর পানিতে লোহা, ম্যাঙ্গানিজ ও সিসার মতো ভারী ধাতুর মাত্রাও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। পানির দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কম এবং মোট দ্রবীভূত কঠিন পদার্থের পরিমাণ বেশি হওয়ায় ‘ওয়াটার কোয়ালিটি ইনডেক্স’ অনুযায়ী এই নদের পানি খুবই নিম্নমানের হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা। তাঁদের মতে, শিল্প এলাকাসংলগ্ন ভাটির দিকে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। অনিয়ন্ত্রিত শিল্পবর্জ্য, টেক্সটাইল কারখানার বর্জ্য এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সুতাংয়ের পরিবেশের দ্রুত অবনতি ঘটছে।

গবেষক মো. শাকির আহম্মদ বলেন, মিঠাপানির এই দূষণ দীর্ঘ মেয়াদে মানবস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।

ভুগছে স্থানীয়রা: বাংলাদেশ নদী কমিশনের তালিকাভুক্ত এই আন্তসীমান্ত নদ ভারতের ত্রিপুরা থেকে উৎপন্ন হয়ে হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। একসময় হাওর অঞ্চলের যোগাযোগ ও জীবিকার প্রধান উৎস হলেও এখন এটি মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, অনেক শিল্পকারখানা বর্জ্য পরিশোধন না করে সরাসরি নদে ফেলছে। ফলে করাব, ছড়িপুর, উচাইল, রাজিউড়া, সাধুর বাজারসহ নদতীরবর্তী এলাকায় পানি কালো হয়ে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটছে।

সুতাং নদ দূষণের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে স্থানীয়দের মাঝে। নদতীরবর্তী ভাদগরি গ্রামের বাসিন্দা শফিক মিয়া বলেন, সুতাংয়ের পানিতে এখন গোসল করলে শরীরে চুলকানি শুরু হয়।

সাধুর বাজার এলাকার শিক্ষক গুলনাহার বেগম বলেন, ‘নদের দুর্গন্ধে এলাকায় বসবাস ও স্কুলে যাতায়াত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি আগে এমন ছিল না।’

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই দূষিত পানি সেচ হিসেবে ব্যবহারের ফলে ভারী ধাতু ধানের মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। এর ফলে দীর্ঘ মেয়াদে ক্যানসার, স্নায়ুরোগসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

গবেষক ও পরিবেশবিদেরা সুতাং রক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের মতে এই নদী রক্ষায় শিল্পকারখানায় বাধ্যতামূলক বর্জ্য শোধনাগার চালু ও কার্যকর করতে হবে। এ ছাড়া প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, নদীর পানির নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে পরিবেশ-সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগও নিতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

আ.লীগ নেতারা চাঁদাবাজিতে ব্যস্ত ছিলেন, মন্ত্রীরাও প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পেতেন না: আব্দুল মোমেন

তৃতীয় মাত্রার জিল্লুরের সহধর্মিণী পেলেন বিএনপির মনোনয়ন

মির্জাপুরে মাটি খুঁড়ে মা ও নবজাতকের বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার

দুর্নীতি করলে ২৪ ঘণ্টাও থাকতে পারবে না, আজও একজনকে বিদায় দিয়েছি: শিক্ষামন্ত্রী

ছুরিকাহত জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালের উপপরিচালক ঢামেকে ভর্তি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত