Ajker Patrika

চায়ের কাপে চট্টগ্রামের গল্প, ‘সিলন আমার শহর’

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
চায়ের কাপে চট্টগ্রামের গল্প, ‘সিলন আমার শহর’
চট্টগ্রামের নেভি কনভেনশন সেন্টারে ৩ সেপ্টেম্বর বসেছিল ‘সিলন আমার শহর’ এর মেগা আসর। ছবি: আজকের পত্রিকা

এক কাপ চায়ের সঙ্গে চট্টগ্রামের গল্প কি বলা যায়? যায়। সেই গল্পে যেমন আছে কর্ণফুলীর ঢেউ, তেমনি আছে বন্দর আর রেলপথের ইতিহাস। আছে মেজবানের ঘ্রাণ, বেলা বিস্কুটের স্বাদ, চায়ের আড্ডা আর প্রিয় শহরকে ঘিরে মানুষের অসংখ্য স্মৃতি। চট্টগ্রামকে এমনই নানা চেনা-অচেনা গল্পের ভেতর দিয়ে নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগ করে দিল ‘সিলন আমার শহর’।

৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের নেভি কনভেনশন সেন্টারে বসেছিল এই আয়োজনের মেগা আসর। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, খাবার, সংগীত আর মানুষের আবেগ—সবকিছুকে এক সুতোয় গেঁথে বন্দরনগরীর নিজস্ব গল্প তুলে ধরা হয় সেখানে।

বাংলাদেশের প্রতিটি শহরেরই আছে আলাদা একটি পরিচয়। কোথাও ইতিহাস কথা বলে স্থাপত্যে, কোথাও খাবারে, কোথাও মানুষের মুখে মুখে ফিরে আসে হারিয়ে যাওয়া দিনের গল্প। শহর শুধু ইট-পাথরের ভবন আর ব্যস্ত সড়কের নাম নয়; শহর মানে তার মানুষ, তাদের স্মৃতি, অভ্যাস, সংস্কৃতি ও আবেগ। সেই ভাবনা থেকেই সিলন টি শুরু করেছে ‘সিলন আমার শহর’ ক্যাম্পেইন। আর এই যাত্রার প্রথম শহর হিসেবে তারা বেছে নিয়েছে চট্টগ্রামকে।

ক্যাম্পেইনের শুরু থেকেই চট্টগ্রামের মানুষকে যুক্ত করা হয় এই গল্প বলার আয়োজনে। শহরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিভিন্ন অনুষঙ্গ নিয়ে তৈরি করা হয় বিশেষ নকশার সিলন টি প্যাকেজিং। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও চলে ‘আমার শহর’ কনটেস্ট। সেখানে চট্টগ্রামের মানুষ তাঁদের প্রিয় শহরকে ঘিরে শেয়ার করেন ব্যক্তিগত স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও ভালোবাসার গল্প।

অসংখ্য অংশগ্রহণকারীর মধ্য থেকে প্রতি সপ্তাহে নির্বাচিত হন বিজয়ীরা। পরে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত বিজয়ীদের হাতে মেগা ইভেন্টে তুলে দেওয়া হয় বিশেষ পুরস্কার।

তবে আয়োজনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল—চট্টগ্রামকে শুধু দেখানো নয়, অনুভব করার সুযোগ করে দেওয়া।

পুরোনো শহরের পথে ফিরে দেখা

নেভি কনভেনশন সেন্টারের আয়োজনজুড়ে যেন তৈরি হয়েছিল অন্য এক চট্টগ্রাম। বর্তমানের ব্যস্ত নগরীর আড়ালে থাকা পুরোনো শহরের গল্প উঠে আসে সেখানে।

চট্টগ্রামের পুরোনো স্থাপত্য, ঐতিহাসিক স্থান, বন্দর ও রেলওয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা অধ্যায়, শহরের সাংস্কৃতিক বিবর্তন—সবই উপস্থাপিত হয় নানা অভিজ্ঞতামূলক আয়োজনে।

কিছু গল্প হয়তো চট্টগ্রামের মানুষ প্রতিদিনের চলার পথে দেখেন, কিন্তু তার পেছনের ইতিহাস জানেন না। আবার কিছু গল্প সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে। পুরোনো চিত্রকর্ম ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের মাধ্যমে সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের দরজাটিই যেন খুলে দেওয়া হয় দর্শনার্থীদের সামনে।

একটি শহর কীভাবে বদলে যায়, সময় কীভাবে তার চেহারা পাল্টে দেয়, অথচ মানুষের স্মৃতিতে তার কত কিছুই অপরিবর্তিত থেকে যায়—আয়োজনের বিভিন্ন পর্বে উঠে আসে সেই গল্প।

মেজবানের ঘ্রাণে, বেলা বিস্কুটের স্বাদে

চট্টগ্রামের গল্প খাবার ছাড়া অসম্পূর্ণ। তাই আয়োজনেও বিশেষ জায়গা করে নেয় নগরীর খাদ্যসংস্কৃতি।

মেজবানের ঐতিহ্য থেকে বেলা বিস্কুট, চায়ের আড্ডা থেকে স্থানীয় নানা স্বাদ—খাবারের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয় চট্টগ্রামের মানুষের জীবনযাপন ও সংস্কৃতির পরিচিত চিত্র।

কারণ চট্টগ্রামে খাবার শুধু খাবার নয়; অনেক খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্মৃতি, আতিথেয়তা ও মানুষের সম্পর্ক। একটি মেজবান যেমন কেবল খাবারের আয়োজন নয়, তেমনি এক কাপ চায়ের আড্ডাও কখনো কখনো হয়ে ওঠে বন্ধুত্ব আর গল্পের দীর্ঘ স্মৃতি।

গানের সুরে শহরের আরেক গল্প

চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক পরিচয়ও ছিল আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় উঠে আসে এ অঞ্চলের সংগীত ও ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গ।

ইতিহাস যেখানে শহরের শেকড়ের কথা বলে, খাবার যেখানে মানুষের জীবনযাত্রার কথা বলে, সেখানে সংগীত যেন বলে মানুষের মনের কথা। আয়োজনজুড়ে তাই চট্টগ্রামকে দেখা গেছে শুধু একটি শহর হিসেবে নয়, বরং জীবন্ত একটি সংস্কৃতি হিসেবে।

যাঁরা চট্টগ্রামের গল্প লিখেছেন

অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল ‘সিলন আমার শহর বিশেষ ব্যক্তিত্ব সম্মাননা’। নিজ নিজ ক্ষেত্রে অবদানের মাধ্যমে চট্টগ্রামের পরিচয়, সংস্কৃতি ও সমাজকে সমৃদ্ধ করার স্বীকৃতি হিসেবে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের এ সম্মাননা দেওয়া হয়।

সম্মাননা পান একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক আবুল মোমেন, স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ জেরিনা হোসেন, নগর পরিকল্পনাবিদ ইঞ্জিনিয়ার দেলোয়ার হোসেন মজুমদার এবং লেখক ও গবেষক হারুন রশিদ।

সম্মানিত ব্যক্তিত্বদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শহীদুল্লাহ চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, আবুল খায়ের গ্রুপ।

এই সম্মাননা যেন শুধু ব্যক্তিদের স্বীকৃতি নয়; বরং তাঁদের কাজের মধ্য দিয়ে যে চট্টগ্রাম উঠে এসেছে, সেই চট্টগ্রামের প্রতিও এক ধরনের শ্রদ্ধা।

চট্টগ্রাম শেষ নয়, শুরু

ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, গণমাধ্যমকর্মী, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ক্যাম্পেইনের বিজয়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে মেগা ইভেন্ট হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।

চট্টগ্রাম ছিল ‘সিলন আমার শহর’-এর প্রথম অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের পর্দা নামলেও গল্প বলা শেষ হয়নি। কারণ বাংলাদেশের প্রতিটি শহরেরই রয়েছে আলাদা গল্প—কোথাও নদীর গল্প, কোথাও পাহাড়ের; কোথাও রাজবাড়ির, কোথাও লোকসংগীতের; কোথাও বিখ্যাত কোনো খাবারের, আবার কোথাও সাধারণ মানুষের অসাধারণ জীবনের।

চট্টগ্রাম তার গল্প বলেছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, খাবার, গান আর মানুষের স্মৃতির ভেতর দিয়ে।

এখন শুধু অপেক্ষা—চায়ের কাপে পরের শহরের গল্পটি কীভাবে উঠে আসে, আর ‘সিলন আমার শহর’-এর পরবর্তী গন্তব্য হয় কোন শহর।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত