Ajker Patrika

নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দিলেই মেলে সার, কৃত্রিম সংকটে বিপাকে নওগাঁর চাষিরা

নওগাঁ প্রতিনিধি
নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দিলেই মেলে সার, কৃত্রিম সংকটে বিপাকে নওগাঁর চাষিরা
জমিতে সার দিচ্ছেন এক কৃষক। ছবিটি নওগাঁ সদর উপজেলার ডাক্তার মোড় এলাকা থেকে তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

নওগাঁর মাঠজুড়ে এখন আমন ধানের সবুজের সমারোহ। পরিচর্যা ও আবাদে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলার কৃষকেরা। তবে আমনের এই ভরা মৌসুমে সারের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃষকদের পকেট কাটছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী।

৫০ কেজির ইউরিয়া ও ডিএপি সারের বস্তায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকেরা।

মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জমিতে পানি সেচ, কীটনাশক এবং আগাছা পরিষ্কারের পাশাপাশি এখন সারের প্রয়োজন। কিন্তু বাজারে গিয়ে চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না কৃষকেরা। অনেক ক্ষেত্রে সারের সংকট দেখিয়ে খোলা বাজার থেকে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। ফলে সারসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলে বিঘাপ্রতি অন্তত ১ হাজার টাকা বাড়তি গুনতে হচ্ছে। সিন্ডিকেটের এমন দৌরাত্ম্যে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষকেরা।

মহাদেবপুর উপজেলার খোদ্দনারায়নপুর এলাকার কৃষক আব্দুর রহমান আড়াই বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি জানান, কয়েক দফা বাজারে ঘুরেও চাহিদামতো ইউরিয়া ও ডিএপি সার পাননি। বাধ্য হয়ে বাড়িতে জমিয়ে রাখা সামান্য সারই কোনোমতে জমিতে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সারের এই বাড়তি দামের কারণে চলতি এক মৌসুমেই আমার দেড় হাজার টাকার বেশি অতিরিক্ত খরচ হয়ে যাচ্ছে। বাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে না, আর পেলেও দিতে হচ্ছে অস্বাভাবিক দাম।’

মান্দা উপজেলার গণেশপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদের হিরা বলেন, ‘অতিরিক্ত দামের কারণে কৃষকদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। পত্রিকা আর টিভিতে শুনি সরকারি গুদামে নাকি সার উপচে পড়ছে। অথচ দোকানে গেলে বাড়তি টাকা না দিলে সারও মেলে না।’

সদর উপজেলার হাপানিয়া এলাকার কৃষক আফছার মণ্ডল বলেন, ‘নির্ধারিত দামে কিনতে গেলে বলা হয়, সার নেই। কিন্তু যখনই বাড়তি টাকা হাতে দেওয়া হচ্ছে, তখনই সার বের হয়ে আসছে। সঠিক সময়ে জমিতে সার দিতে না পারলে পরে দিয়ে তো লাভ নেই, ফসলের কাঙ্ক্ষিত ফলনই পাওয়া যাবে না।’

নওহাটা বাজারের খুচরা সার ব্যবসায়ী মেসার্স পাল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সুমন্ত পাল বলেন, ‘কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সারের সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়তি দামে সার কিনে কিছুটা লাভে বিক্রি করতে হয়।’

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের নওগাঁ জেলার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মিজানুর রহমান তালুকদার বলেন, ‘জেলায় সারের আসলে কোনো সংকট নেই। তবে যদি কোনো অসাধু চক্র বা ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের কাছে বাড়তি সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৯৬ হাজার ১২৫ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ চাষাবাদের বিপরীতে ৪৩ হাজার ৭৯ টন সারের বরাদ্দ রয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত। কিন্তু বাজারে নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, ‘জেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণ সারের মজুত ও সরবরাহ রয়েছে। সারের সংকট হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। নওগাঁ বর্তমানে সবচেয়ে ভালো অবস্থায় আছে। ডিলারের কাছে গিয়ে কোনো কৃষক ৫ কেজি বা ১০ কেজি যা-ই চাইবে, তা-ই দিতে হবে। প্রতিদিনই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত দামের বাইরে কেউ বিক্রি করলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যে ডিলার বা খুচরা ব্যবসায়ী দাম বেশি নিচ্ছেন, তাঁর নাম-ঠিকানা আমাদের দিন। সত্যতা পেলে তাৎক্ষণিক ডিলারশিপ বাতিল করা হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত