Ajker Patrika

নারীদের স্বাবলম্বী করতে মহিলা মার্কেট, অধিকাংশ দোকান পরিচালনায় পুরুষেরাই

তাজরুল ইসলাম, পীরগাছা (রংপুর)
নারীদের স্বাবলম্বী করতে মহিলা মার্কেট, অধিকাংশ দোকান পরিচালনায় পুরুষেরাই
দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ দেউতি হাটের মহিলা মার্কেট। ছবি: আজকের পত্রিকা

নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্য নিয়ে সরকারি অর্থায়নে নির্মাণ করা হয়েছিল মহিলা মার্কেট। উদ্দেশ্য ছিল—নারীরা সেখানে ব্যবসা করবেন, তৈরি হবে তাঁদের নিজস্ব আয়ের সুযোগ। কিন্তু রংপুরের পীরগাছায় সেই উদ্যোগের বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

উপজেলার তিনটি মহিলা মার্কেটের অধিকাংশ দোকানেই নেই নারী উদ্যোক্তা। দু-একটি দোকান ছাড়া বেশির ভাগ দোকান পরিচালনা করছেন পুরুষেরা। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বরাদ্দ পাওয়া অনেক দোকান অতিরিক্ত টাকা ও জামানত নিয়ে অন্যের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। কোনো দোকান ব্যবহৃত হচ্ছে গুদাম হিসেবে, আবার কোনোটি দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। এরই মধ্যে অনেক দোকানের ভাড়া জমেছে বকেয়া।

এতে একদিকে নারীরা ব্যবসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারও হারাচ্ছে রাজস্ব।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নে উপজেলার পারুল ইউনিয়নের দেউতি বাজার, কান্দি ইউনিয়নের কান্দির হাট এবং ছাওলা ইউনিয়নের পাওটানা হাটে তিনটি মহিলা মার্কেট নির্মাণ করা হয়। তিনটি মার্কেটে মোট দোকান রয়েছে ৩০টি।

সরেজমিনে দেউতি মহিলা মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, ১২টি দোকানের মধ্যে চার-পাঁচটি দোকান পুরুষেরা পরিচালনা করছেন। কয়েকটি দোকান বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালামাল রাখার গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ‘সূজয় কসমেটিক স্টোর’ নামের একটি দোকান দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে।

পাওটানা হাট মহিলা মার্কেটেও দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। স্থানীয়দের ভাষ্য, এখানকার অধিকাংশ দোকানেই মূল বরাদ্দপ্রাপ্তরা ব্যবসা করছেন না। অনেক দোকান অন্যের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বরাদ্দপ্রাপ্তরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে সেই অর্থ নিজেদের কাছে রাখছেন।

স্থানীয় নারী উদ্যোক্তা শাপলা আক্তার বলেন, ‘ভাঙা ঘরে দোকান করি। রাতে চোর-ডাকাতের ভয় থাকে। তাই দোকানেই থাকতে হয়। মহিলা মার্কেটে দোকান পেলে নিরাপদে ব্যবসা করতে পারতাম। এটি তো আমাদের নারীদের জন্য করা হয়েছে।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, মহিলা মার্কেটের বেশ কিছু দোকান প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের গুদাম হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনকি মার্কেটের সামনের জায়গাতেও গড়ে উঠেছে বিভিন্ন অবৈধ দোকানপাট।

স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘নারীদের অগ্রগতি ও স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্যে সরকারের নেওয়া উদ্যোগটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।’ নীতিমালা অনুযায়ী প্রকৃত নারী উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয়ের তথ্য বলছে, তিনটি মহিলা মার্কেটের ৩০টি দোকানের বিপরীতে মোট ২ লাখ ২১ হাজার ৩০০ টাকা ভাড়া বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে দেউতি মহিলা মার্কেটের ১২টি দোকানে ১ লাখ ১৬ হাজার ৫০০ টাকা, কান্দি মহিলা মার্কেটের ৮টি দোকানে ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা এবং পাওটানা হাট মহিলা মার্কেটের ১০টি দোকানে ৫৫ হাজার ১০০ টাকা ভাড়া বকেয়া।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান জেমি বলেন, বকেয়া ভাড়া পরিশোধের জন্য কার্যালয় থেকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। যারা এখনো বকেয়া পরিশোধ করেননি, তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দেউতি মহিলা মার্কেটের বন্ধ থাকা দোকানগুলোর বিষয়েও খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারি অর্থে নির্মিত এসব মার্কেটের মূল লক্ষ্য ছিল নারীদের জন্য ব্যবসার নিরাপদ ও স্থায়ী সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু দোকান বরাদ্দের পর সেগুলোর ব্যবহার যদি মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে যায়, তাহলে প্রকল্পের সুফলও প্রশ্নের মুখে পড়ে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত বকেয়া ভাড়া আদায়, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা দোকানের বরাদ্দ বাতিল এবং বিদ্যমান নীতিমালা অনুসরণ করে প্রকৃত নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে এসব দোকান পুনরায় বরাদ্দ দেওয়া হোক। এতে সরকারি সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি নারীদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগটিও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত