Ajker Patrika

রংপুর অঞ্চল: কৃষকের নিরানন্দ ঈদ

শিপুল ইসলাম, রংপুর 
রংপুর অঞ্চল: কৃষকের নিরানন্দ ঈদ
হঠাৎ বৃষ্টিতে আলুখেত ডুবে যাওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ে আলু তোলা যায়নি। কিছুটা পানি শুকাতেই সেই আলু তুলছেন কৃষক। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার দোহাজারী মাঠ থেকে গত মঙ্গলবার তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

ঈদুল ফিতর সমাগত হলেও উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের মনে নেই উৎসবের আনন্দ। আছে শুধু লোকসানের হিসাব আর অনিশ্চয়তার দীর্ঘশ্বাস। মাঠজুড়ে কষ্টে ফলানো আলুর ন্যায্য দাম না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক। উৎপাদন খরচ যেখানে কেজিতে ১৫-১৬ টাকা, সেখানে বাজারদর নেমে এসেছে ৯-১০ টাকায়; তা-ও মিলছে না ক্রেতা। তার ওপর হঠাৎ বৃষ্টিতে ১ হাজার ৭৩২ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে উঠেছে। প্রায় ২৩ লাখ কৃষক পরিবার যখন চাষাবাদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তখন ঈদের আনন্দ তাদের কাছে পরিণত হয়েছে নিঃশব্দ এক বিষাদে।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছর ঈদুল ফিতরের আগে প্রধানত রংপুর কৃষি অঞ্চলে (রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধায়) আলু ও তামাক ঘরে ওঠে কৃষকদের। এসব ফসল বিক্রি করে ঈদের কেনাকাটা ও বোরো চাষাবাদ করেন তাঁরা। কিন্তু এবার ফসল ঘরে উঠলেও উৎপাদন খরচও ওঠার মতো দাম নেই। কম দামেও ক্রেতারও দেখা মিলছে না বলে কৃষকদের অভিযোগ।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, রংপুর অঞ্চলে ১ লাখ ৫ হাজার ৮৮৫ হেক্টর জমিতে আলু এবং ২১ হাজার ২৯৫ হেক্টরে তামাক চাষ হয়েছে। এসব ফসলের প্রায় ৬০ শতাংশ ঘরে তুলেছেন কৃষক। তবে গত ১১ থেকে ১৩ মার্চ পর্যন্ত বৃষ্টিতে ১ হাজার ৭৩২ হেক্টর জমির আলু, ভুট্টা, গম ও শাকসবজির ক্ষতি হয়। এই অঞ্চলে ২৩ লাখ ৪২ হাজার ৭৫২টি কৃষক পরিবার কৃষি আয়ের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের দাম না থাকায় দিশেহারা তারা।

গত মঙ্গলবার রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়ক ঘেঁষা তারাগঞ্জের পাকারপুল মাঠে বিষণ্ন মনে আলুখেতে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষক জহুরুল হককে ঈদের প্রস্তুতি কেমন জানতেই তিনি বলেন, ‘কৃষকের ফির ঈদ আছে বাহে। কৃষক কি বেতন বোনাস পায়? কৃষক খালি পায় কষ্ট করি ফসল ফলার আর সেই ফসলোত লস খাবার। এই দুইটাই কৃষকের কাম। ঈদ তো দূরের কথা, ধার করি আলু নাগাছি, সেই টাকা শোধ কীভাবে করিম, সেই চিন্তায় আছি।’

জহুরুল হক বলেন, প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে তাঁর খরচ পড়েছে ১৫ থেকে ১৬ টাকা। বর্তমান বাজারে ৯ থেকে ১০ টাকা কেজি। মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজিতে লোকসান ৬ টাকা, তবু ক্রেতার দেখা মিলছে না।

দুই একর জমি চাষাবাদ করে সংসার চলে তারাগঞ্জের প্রামাণিকপাড়া গ্রামের কৃষক আজহারুল ইসলামের। গত বছর আলুতে লোকসান হলেও এবারও তিনি এক একরে আলু চাষ করেছেন। আজহারুল বলেন, ‘লস হইলে কি জমি ফেলে রাখব কন? দাম হইবে সেই আশায় এবারও আলু লাগাছি। কিন্তু আলুর তো দাম নাই, লস করি আলু বেচাবো সেই পার্টিও নাই। তিন দিন পর ঈদ, আলু বেচে বউ-ছাওয়ার কাপড় কিনার কথা ছিল। এখন উল্টা আলু তোলা টাকাই হওলাদ নিবার নাগছে। এবারে ঈদ মাটি।’

হাড়িয়ারকুঠি গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, ‘প্রতিবছর পাইকারের বাড়িত আসি আলু, তামাক কিনি নিয়া যায়। কায়ও কায়ও আগাম টাকাও দিছল। এবার পাইকার খুঁজে পাওয়া যাওছে না। টাকার অভাবে এল্যাও বেটির বাড়িত সেমাই-চিনি, কাপড় দিবার পারো নাই। নিয়াত করছু পাইকার পাইলে ১০ টাকাতে লস করি আলু ছাড়ি দেই।’

বামনদীঘি গ্রামের কৃষক লাল মিয়া বলেন, ‘কৃষকের একদিকেও বাচন নাই। একে তো দাম নাই, তার ওপর পানিত ডুবে আলু নষ্ট। হামরা কৃষক মানুষেরা খুব কষ্টে আছি।’

রংপুর কৃষক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক পলাশ কান্তি নাগ বলেন, ‘ঈদ সামনে রেখে যখন শহরে উৎসবের প্রস্তুতি চলছে, তখন উত্তরাঞ্চলের অনেক কৃষকের ঘরে চলছে হিসাব-নিকাশ আর দুশ্চিন্তার দিন। ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেলে ঈদের আনন্দ তাঁদের কাছে অধরাই থেকে যাবে।’

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা প্রয়োজন। এই অঞ্চলে বৃষ্টিতে যেসব ফসলের ক্ষতি হয়েছে, তা খুব বেশি হবে না। ওই আলু কৃষকেরা বিক্রি করে দেবেন।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

যুদ্ধ এড়াতে গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব দিয়েছিল ইরান, ‘অভিভূত’ হয়েছিল ব্রিটিশরা

তুরস্ক ও সিঙ্গাপুরে ঈদুল ফিতরের তারিখ ঘোষণা, মধ্যপ্রাচ্যে চাঁদ দেখার প্রস্তুতি

অভিনেতা শামস সুমনের জানাজা সম্পন্ন, পরিবার দেশে ফিরলে দাফন

চাঁদ দেখা যায়নি, সৌদি আরবে ঈদ শুক্রবার

সান্তাহারে নীলসাগর এক্সপ্রেসের ৯ বগি লাইনচ্যুত, উত্তরের ৫ জেলার সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত