Ajker Patrika

ভুল দাগে উচ্ছেদ, বিপুল ক্ষয়ক্ষতি

  • উচ্ছেদের কারণে ব্যবসায়ীর বিপুল ক্ষতি, পুড়ে ভাইয়ের মৃত্যু।
  • আদালতের নাজির ও আমিন কমিশনারের পারস্পরিক দোষারোপ।
  • ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী জেলা প্রশাসনে লিখিত অভিযোগ করলেও নেওয়া হয়নি ব্যবস্থা।
সাজন আহম্মেদ পাপন, কিশোরগঞ্জ 
ভুল দাগে উচ্ছেদ, বিপুল ক্ষয়ক্ষতি

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে আদালতের ডিক্রি (রায়) অনুযায়ী সম্পত্তির দখল বুঝিয়ে দিতে গিয়ে ভুল দাগে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর অভিযোগ উঠেছে।

উচ্ছেদে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দাবি, আদালতের ডিক্রি ছিল এক দাগে, কিন্তু উচ্ছেদ চালানো হয়েছে সম্পূর্ণ অন্য দাগে। আকস্মিক এই অভিযানে কোটি টাকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়েছে। সে সময়ে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীর ভাই পুড়ে মারা গেছেন।

আদালতের রায় অনুযায়ী সম্পত্তির দখল বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্বে থাকা কিশোরগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের তৎকালীন নাজির ও জমির মাপজোকের দায়িত্বে থাকা আদালতের আমিন কমিশনার একে অপরের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন। এ বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটি কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছে।

ঘটনাটি ঘটেছে করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের কুকিমাদল উত্তর কান্দাইল এলাকায় গত বছরের ২৪ নভেম্বর।

জানা গেছে, তৎকালীন নাজির মনজুরুল ইসলাম ও আমিন কমিশনার শহীদুল ইসলাম আদালতের ডিক্রি পাওয়া পক্ষকে জমির দখল বুঝিয়ে দিতে যান। এ সময় নাজিরের উপস্থিতিতে আমিন কমিশনারের মাপজোক ও সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া জমিতে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আল-আমিন কবীরের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়।

সংশ্লিষ্ট নথি ও ভুক্তভোগীর বক্তব্য অনুযায়ী, গত বছরের ২২ মে কুকিমাদল গ্রামের দুলাল মিয়াসহ ১৩ জন বাদী হয়ে সুলতান মিয়া ও নজরুল ইসলামসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে একটি বাঁটোয়ারা মামলা করেন। দেড় মাসের মাথায় ২ জুলাই মামলাটি নিষ্পত্তি হয় এবং ৭ জুলাই প্রাথমিক ডিক্রি পায় দুলাল মিয়ার পক্ষ।

আদালতের নির্দেশ ছিল, ১০০৮ এবং ৯৫৪ নম্বর দাগে উচ্ছেদ চালানোর। কিন্তু উচ্ছেদ চালানো হয় ১০১১ নম্বর দাগে, যেখানে ছিল নজরুল ইসলামের মনোহারি ও হার্ডওয়্যারের দোকান। উচ্ছেদ ও অগ্নিকাণ্ডের পর এ জমি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।

ভুক্তভোগী নজরুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এসিল্যান্ড ও নায়েবের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই জায়গাটি সম্পূর্ণ আমার নিজের। আমিন কমিশনারের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে মব সৃষ্টি করে প্রশাসন আমাকে অবৈধভাবে উচ্ছেদ করেছে।’

নজরুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো নোটিশ না দিয়েই আমার ৫০ লাখ টাকার মার্কেট ও দোকানে থাকা ১ কোটি টাকার মালামাল পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আগুনে পুড়িয়ে আমার ভাই হাফেজ সুলতানকে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আদালতে মামলা করলেও পুলিশ কোনো

ব্যবস্থা নিচ্ছে না। উল্টো আসামিরা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন।’

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দা মতিউর রহমান ও ডাক্তার শফিকুর রহমান জানান, সেদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে মোকাররম নামের এক ব্যক্তির উসকানিতে কিছু ভাড়াটে লোক লাঠিসোঁটা ও শাবল-কুড়াল নিয়ে দোকানের চালের ওপর উঠে ভাঙচুর শুরু করে।

মতিউর রহমান ও ডাক্তার শফিকুর রহমান আরও জানান, একপর্যায়ে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে পুরো ঘরে আগুন লেগে যায়। এই আগুনে গুরুতর দগ্ধ হন নজরুলের ছোট ভাই হাফেজ সুলতান। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ২০ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে হার মানেন তিনি। যেদিন সুলতান অগ্নিদগ্ধ হন, সেদিনই জন্ম নেয় তাঁর পুত্রসন্তান।

এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে নিহত সুলতানের স্ত্রী সুমা আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামীই ছিল একমাত্র উপার্জনকারী। ছোট ছোট তিনটা বাচ্চা নিয়ে আমি এখন অথই সাগরে। মেজো বাচ্চাটা সারা দিন কাঁদে আর বলে, “আমার আব্বারে মাটির নিচ থেকে উঠাইয়া এনে দাও।” এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ফাঁসি চাই।’

এ বিষয়ে করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমরানুল কবির বলেন, উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে একটি মামলা চলছে, বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।

এদিকে উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে নাজির ও আমিন কমিশনার পারস্পারিক দোষারোপ করছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের তৎকালীন নাজির মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘আদালতের নিয়োগ পাওয়া আমিন কমিশনার সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়ার পর পুলিশ প্রশাসন ও ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে আমরা উচ্ছেদ কার্যক্রম চালাই।’

অপরদিকে আদালতের আমিন কমিশনার শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘দখল প্রদানের দায়িত্ব হলো নাজিরের, আমার না। আমি তো মাপজোক করে দিয়েছি। ভুলভ্রান্তি হলে নাজির

এটার জবাবদিহি করবেন। যদি মাপজোকে ভুল হয়, তাহলে আমি জবাবদিহি করব।’

এ বিষয়ে ডিক্রি অনুযায়ী সম্পত্তির দখল বুঝিয়ে দেওয়া করিমগঞ্জের এসিল্যান্ড ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আল-আমিন কবীরের সঙ্গে কথা হয়। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘নজরুলের পরিবারের নোটিশ না পাওয়ার অভিযোগের বিষয়টি আমিও অবগত হয়েছি। তবে আমি আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেছি মাত্র।’

আল-আমিন কবীর বলেন, আদালতের নির্দেশনায় কোনো ভুল বা অসংগতি হয়ে থাকলে, তার প্রতিকারও আদালতের মাধ্যমেই সম্ভব।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত