Ajker Patrika

কাজ হারাচ্ছেন স্বর্ণকারেরা, পেশা বদল করছেন অনেকে

সাদ্দাম হোসেন, ঠাকুরগাঁও 
আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৩: ৩৩
কাজ হারাচ্ছেন স্বর্ণকারেরা, পেশা বদল করছেন অনেকে
ছবি: আজকের পত্রিকা

ঠাকুরগাঁও শহরে একসময় ৬০০ থেকে ৭০০ জন সোনার কারিগর থাকলেও এখন সেই সংখ্যা ২০০ থেকে ২৫০ জনে নেমে এসেছে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কারিগর কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। সংসার চালাতে না পেরে বাধ্য হয়ে অনেকে অটোরিকশা চালাচ্ছেন, রাজমিস্ত্রির জোগালি দিচ্ছেন কিংবা পানের দোকান বা সবজি বিক্রি করছেন।

স্থানীয় সোনা ব্যবসায়ী ও কারিগরদের ভাষ্য, সোনার চড়া দাম, বিদেশি তৈরি গয়নার বাজার দখল ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এ সংকটের প্রধান কারণ। দীর্ঘদিন কাজ না থাকায় অনেক কারিগরের হাতুড়ি ও যন্ত্রপাতিতে জং ধরেছে। সংসারের খরচ মেটাতে কেউ কেউ কাজের ড্রয়ার ও আসবাবপত্রও বিক্রি করে দিচ্ছেন।

ঠাকুরগাঁও স্বর্ণশিল্পী শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সুকুমার রায় মঙ্গল জানান, আগে কারিগরদের কাজের অভাব ছিল না। এখন অনেকের সমিতির চাঁদা দেওয়ার সামর্থ্যও নেই। বিদেশ থেকে ২২ ক্যারেটের তৈরি গয়না আসায় স্থানীয়ভাবে গয়না বানানোর ফরমাশ একপ্রকার বন্ধ বললেই চলে।

নর্থ সার্কুলার রোডের সুমা জুয়েলার্সের মালিক মদন কুমার দত্ত ও কারিগর সুরেশ চন্দ্র জানান, ক্রেতারা এখন আর অর্ডার দিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন অপেক্ষা করতে চান না। দোকান থেকে সরাসরি রেডিমেড গয়না কিনে নিয়ে যেতেই তাঁরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

নাজমা বেগম, নাফিসা তাসনিম, সুমি আক্তার ও মাসুদ রানা নামের কয়েকজন ক্রেতা বলেন, রেডিমেড গয়নার ডিজাইন সুন্দর, সময় বাঁচে এবং সোনার মান ও বিশুদ্ধতা নিয়ে স্বস্তি পাওয়া যায়। ৩৫ বছরের অভিজ্ঞ স্বর্ণকার মো. লিটন ইসলাম বলেন, আগে সোনার দাম কম থাকায় প্রচুর কাজ হতো, এখন দাম বাড়ায় অর্ডারি কাজ কমে গেছে।

আবার নিউ মিডিয়া জুয়েলার্সের গোপাল চন্দ্র জানান, বিদেশি গয়না মেশিনে দ্রুত ও আকর্ষণীয় ফিনিশিংয়ে তৈরি হয়। যে হার বানাতে হাতে চার দিন লাগে, মেশিনে তা এক দিনে সম্ভব। কিন্তু ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার এসব আধুনিক মেশিন কেনার সামর্থ্য ছোট কারিগরদের নেই। এর প্রভাবে স্থানীয় কারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

হৃদয় জুয়েলার্স বালা কারখানার স্বত্বাধিকারী রনিক চন্দ্র বণিক বলেন, আগে পাঁচ-সাতজন শ্রমিক কাজ করলেও এখন দুজনের কাজ চালানোই কঠিন। আশপাশের চেইন ও রঙের কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি জানান, দেশেও হলমার্ক ও কেডিএম প্রযুক্তিতে মানসম্মত গয়না বানানো সম্ভব হলেও মহাজনেরা বিদেশি গয়না বিক্রি করতেই বেশি আগ্রহী। কাজের সংকটে আয় কমে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মও এই পেশায় আসছে না।

কারিগর বিপ্লব কুমার জানান, দিনে আয় এখন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। কারিগর জয়নাল সিকদার বলেন, চার বছর ধরে কাজ শিখে এত কম আয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। ফলে জাকির উদ্দীন, ভবেশ রায় ও জীবন রায়ের মতো অনেক কারিগর এখন কাজ ছেড়ে অটোরিকশা চালানো বা দোকান ব্যবস্থাপকের কাজ নিচ্ছেন। জীবন রায় জানান, তাঁর পাশের দুই-তিনটি কারখানা তিন মাস ধরে বন্ধ থাকায় সেখানকার কারিগরেরা অটোরিকশা চালানো শুরু করেছেন।

স্বর্ণশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, স্থানীয় কারিগরদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত না করলে ও বিদেশি রেডিমেড গয়নার ওপর নির্ভরতা না কমালে ঠাকুরগাঁওয়ের এই ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প চিরতরে হারিয়ে যাবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত