Ajker Patrika

চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে ইউক্রেনের ড্রোনে প্রাণ হারালেন নান্দাইলের মামুন

নান্দাইল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১: ০৩
চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে ইউক্রেনের ড্রোনে প্রাণ হারালেন নান্দাইলের মামুন
মামুন মিয়া। ছবি: সংগৃহীত

টিনের ভাঙা ঘরের সামনে উঠানে বসে কাঁদছিলেন মা রোকেয়া খাতুন ও স্ত্রী মহিমা আক্তার। আশপাশের মানুষজনও এসে ভিড় করেছেন। কারও মুখে সান্ত্বনার ভাষা নেই। চার মাস আগে পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো মামুন মিয়া যে আর ফিরবেন না, তা যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না তাঁরা।

ময়মনসিংহের নান্দাইলের খারুয়া গ্রামের যুবক মামুন মিয়া (২৫) রাশিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরির আশায় গিয়েছিলেন। পরিবারের অভিযোগ, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর রুশ সেনাবাহিনীর কাছে তুলে দেওয়া হয়। পরে তাঁকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সম্মুখ সমরে পাঠানো হয়। সেখানে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় প্রায় দুই সপ্তাহ আগে নিহত হন মামুন।

মামুন উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খারুয়া গ্রামের মৃত আবুল কাশেমের ছেলে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য ছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর খবর আসার পর থেকে পরিবারটিতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, সংসারের সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় গত ৭ মে ‘জাবাল-এ নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে সাড়ে আট লাখ টাকা চুক্তিতে রাশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি জমান মামুন। তাঁর সঙ্গে আরও প্রায় ৩০ জনের একটি দল ছিল।

পরিবারের অভিযোগ, রাশিয়ায় পৌঁছানোর মাত্র চার দিন পর এজেন্সি ও সংশ্লিষ্ট দালাল চক্র মামুনসহ পুরো দলের যুবকদের রুশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর বা বিক্রি করে দেয়। পরে তাঁদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে জোরপূর্বক ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সম্মুখসমরে পাঠানো হয়।

মামুনের সঙ্গে রাশিয়ায় যাওয়া ঝিনাইদহের রাজন মিয়া গতকাল মঙ্গলবার মামুনের পরিবারকে মোবাইল ফোনে জানান, দুই সপ্তাহ আগে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ভয়াবহ ড্রোন হামলায় মামুন প্রাণ হারান। ওই হামলায় তিনিও (রাজন) গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে দেশে ফেরেন তিনি।

আজ বুধবার দুপুরে মামুনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙা ঘরের সামনে বসে কাঁদছেন তাঁর মা রোকেয়া খাতুন ও স্ত্রী মহিমা আক্তার। সংবাদকর্মীর আসার খবর পেয়ে আশপাশের লোকজনও বাড়িতে ভিড় করেন।

মামুনের স্ত্রী মহিমা আক্তার জানান, গত ২৬ আগস্ট স্বামীর সঙ্গে তাঁর শেষবার কথা হয়েছিল। তখন মামুন জানিয়েছিলেন, তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে আছেন। প্রায় আট কিলোমিটার পথ হেঁটে এসে ওয়াই-ফাই সংযোগ পেয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছিলেন তিনি।

নিহত মামুন মিয়ার মা রোকেয়া খাতুন, স্ত্রী মহিমা আক্তার ও দুই সন্তান। ছবি: আজকের পত্রিকা
নিহত মামুন মিয়ার মা রোকেয়া খাতুন, স্ত্রী মহিমা আক্তার ও দুই সন্তান। ছবি: আজকের পত্রিকা

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মহিমা বলেন, ‘দুই বাচ্চা নিয়ে এহন আমি কীভাবে সংসার চালাব? মরদেহটা কীভাবে দেশে আনব, তা-ও তো জানি না।’ স্বামীর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের কাছে দাবি জানান তিনি।

মামুনের মা রোকেয়া খাতুন বলেন, ‘সংসারের সচ্ছলতা ফেরানোর জন্য চার মাস আগে সাড়ে আট লাখ টাকা ব্যাংকঋণ ও ধার করে বিদেশ পাঠিয়েছি। এখনো কারও টাকা শোধ করতে পারিনি। সমিতির লোকজন এসে ঘুরে যাচ্ছে। একমাত্র সন্তানের এমন করুণ পরিণতি হবে ভাবতেও পারি না। দুইডা নাতিকে কীভাবে বড় করব, তা-ও বুঝতেছি না।’

খারুয়া ইউনিয়নের স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. জামাল উদ্দিন বাচ্চু বলেন, ‘ছেলেটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। লোভে পড়ে রাশিয়া গিয়ে ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছে বলে শুনেছি। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।’

নান্দাইল মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাইনি। পরিবারের কেউ থানায় অভিযোগ দিলে আমরা আইনি পদক্ষেপ নেব।’

নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত বলেন, ‘মামুনের ব্যাপারে বিষয়টি আমি জানি না। পরিবারের লোকজন আমাকে অবহিত করলে বিষয়টি দেখব।’

তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল

রাশিয়ায় উচ্চ বেতন ও সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে ৩০ বাংলাদেশি যুবককে পাঠানোর অভিযোগে এরই মধ্যে তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল ও জামানত বাজেয়াপ্ত করেছে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এসব এজেন্সির মধ্যে জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডও রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত