
ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের গত পাঁচ দশকের প্রথা ভেঙে এক ব্যতিক্রম ও কৌশলগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকায় হাইকমিশনার হিসেবে পেশাদার কূটনীতিকদের ওপর ভরসা রাখলেও, এবার নয়াদিল্লি সেখানে একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিকে পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সাবেক কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী এবং বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদী হতে যাচ্ছেন বাংলাদেশে ভারতের প্রথম রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত হাইকমিশনার। এই নিয়োগ কেবল একজন ব্যক্তির পরিবর্তন নয়, বরং ঢাকার পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দিল্লির পররাষ্ট্রনীতির এক বড় ধরনের ‘কোর্স কারেকশন’ বা দিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেন এই রদবদল?
ভারতের পররাষ্ট্র ক্যাডারে (আইএফএস) ঢাকার পোস্টিং বরাবরই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বা বিক্রম দোরাইস্বামীর মতো পেশাদার কূটনীতিকেরা সেখানে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে কাজ করেছেন বলেই মনে করে দিল্লি। তবে ভারতের নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ এখন মনে করছেন, কূটনীতিকেরা অনেক সময় প্রথাগত প্রোটোকল এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষের নাড়ির স্পন্দন বা রাজনৈতিক বাঁকবদলগুলো সঠিকভাবে ধরতে পারেন না।
গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করার পর নয়াদিল্লির জন্য পরিস্থিতি পাল্টে যায়। দিল্লিতে গুঞ্জন রয়েছে, কিছু সিনিয়র কূটনীতিক বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের রাজনৈতিক হাওয়া বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে একজন রাজনীতিবিদ, যিনি সরাসরি রাজনৈতিক ভাষায় সংলাপ চালাতে সক্ষম, তাঁকে নিয়োগ দেওয়াকে সময়োপযোগী মনে করছে দিল্লি।
আওয়ামী লীগ-পরবর্তী বাস্তবতা
দীর্ঘ ১৫ বছর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে দিল্লির একচ্ছত্র ঘনিষ্ঠতা ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে বাংলাদেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধারণা জন্মেছিল যে ভারত কেবল একটি নির্দিষ্ট দলের বন্ধু।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দিল্লি প্রমাণ করতে চায় যে তারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী, কেবল কোনো নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে নয়।
দীনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন বর্ষীয়ান নেতা যখন ঢাকায় যাবেন, তখন তিনি কেবল দিল্লির সরকারি বার্তাই বহন করবেন না, বরং সরাসরি রাজনৈতিক চ্যানেলগুলো ব্যবহার করে অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙতে পারবেন। এটি ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ পলিসির (প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার নীতি) একটি বিশেষ অংশ।
পশ্চিমবঙ্গ ফ্যাক্টর
দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগের পেছনে সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস হলো তাঁর ভৌগোলিক ও ভাষাগত পরিচয়। ত্রিবেদী পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা একজন নেতা, তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে গেছেন। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর নিবিড় সংযোগ ঢাকার সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক সহজ করতে সাহায্য করবে। তিস্তার পানি বণ্টন বা সীমান্ত হত্যার মতো সংবেদনশীল ইস্যুগুলোতে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতির একটি বড় ভূমিকা থাকে। ত্রিবেদী যেহেতু তৃণমূল এবং বিজেপি উভয় দলের অন্দরমহলের খবর রাখেন, তাই তিনি দিল্লি এবং কলকাতার মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করতে পারবেন, যা আগে কোনো পেশাদার কূটনীতিকের পক্ষে সহজ ছিল না।
রাজনৈতিক নিয়োগের নজির
ভারতের ইতিহাসে রাজনৈতিক নিয়োগ সব সময়ই কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য করা হয়েছে। এর আগের দৃষ্টান্তগুলোর মধ্যে ১৯৯০ সালে নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক যখন তলানিতে ঠেকেছিল, তখন জেনারেল এস কে সিনহাকে পাঠিয়ে সম্পর্ক মেরামত করা হয়েছিল। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কায় একসময় রাজনীতিকদের নিয়োগ দেওয়া হতো। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বিনয় কোয়াত্রার মতো অভিজ্ঞ আমলাকে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে এই প্রথম এমন পদক্ষেপ ইঙ্গিত দেয়, দিল্লি ঢাকাকে বর্তমানে তাদের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘হটস্পট’ হিসেবে বিবেচনা করছে।
ত্রিবেদীর চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
দীনেশ ত্রিবেদীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাংলাদেশে ভারতের প্রতি থাকা জনরোষ বা নেতিবাচক ধারণা দূর করা। পেশাদার কূটনীতিকেরা সাধারণত পর্দার আড়ালে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, কিন্তু একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে ত্রিবেদীকে জনসমক্ষে এসে ভারতের প্রকৃত বন্ধুত্বের বার্তা দিতে হবে।
পাশাপাশি, বিএনপি সরকারের সঙ্গে দিল্লির নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ (যেমন—বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় বা উগ্রবাদের উত্থান) নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে ত্রিবেদীর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। কূটনীতিকেরা যেখানে টেবিলের ওপর আলোচনা করেন, রাজনীতিকেরা সেখানে টেবিলের নিচ দিয়ে বা ব্যক্তিগত সখ্যের মাধ্যমে অনেক বড় অমীমাংসিত ইস্যু সমাধান করতে পারেন।
দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগের মাধ্যমে ভারত এই বার্তাই দিচ্ছে যে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘অটো-পাইলট’ মোড থেকে বেরিয়ে এসে সরাসরি সক্রিয় রাজনৈতিক অংশগ্রহণ চায়। ঢাকার পক্ষ থেকে সম্মতি আসার পর ত্রিবেদী যখন দায়িত্ব নেবেন, তখন তা কেবল দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ই শুরু করবে না, বরং প্রমাণিত হবে যে পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারত কতটা নমনীয় হতে পারে।
পেশাদার কূটনীতিকের চাল আর রাজনীতিবিদের প্রজ্ঞা—এই দুইয়ের মিশেলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
দ্য হিন্দুস্তান টাইমসের নিবন্ধ অবলম্বনে

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বড় ইস্যুর ধার যেন ভোঁতা হয়ে গেছে রাজ্যের অসম, ভাঙাচোরা বাস্তবতায়। নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) ঘিরে যে প্রশ্ন, তা কোনোভাবেই এড়ানো যায় না। গণতান্ত্রিক চুক্তির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নাগরিকের ভোটাধিকার অবাধ ও সুষ্ঠু
৪৩ মিনিট আগে
বঙ্গ রাজনীতির ইতিহাসে এযাবৎ কোনো প্রধান বিরোধী দল পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে ১০০ আসন পায়নি। ক্ষমতাসীন দলগুলো সব সময় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে শাসন করেছে।
১৪ ঘণ্টা আগে
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী গত বছরের ডিসেম্বরে কলকাতায় একের পর এক বিক্ষোভ কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন। এসব বিক্ষোভ ছিল বাংলাদেশি হিন্দু দীপু চন্দ্র দাসের ‘লিঞ্চিংয়ের’ প্রতিবাদে। ‘দীপু দাসের রক্ত বিচার চায়’—এমন টুইটও করেন শুভেন্দু। সঙ্গে তিনি একটি ভিডিও শেয়ার করেন।
১ দিন আগে
ভারতে আশ্রয় নেওয়া ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণে দিল্লিকে অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ। ভারত সরকার বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করার ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পর্যালোচনায় ভারতের সম্মত হওয়া ইঙ্গিত দিতে পারে যে, গভীরভাবে বিভাজিত রাজনৈতিক ইস্যুতে
২ দিন আগে