Ajker Patrika

‘গোদি মিডিয়া’ থেকে বিচারব্যবস্থা—দিল্লিতে কিসের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ‘ককরোচ’দের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৭ জুন ২০২৬, ১৬: ৫০
‘গোদি মিডিয়া’ থেকে বিচারব্যবস্থা—দিল্লিতে কিসের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ‘ককরোচ’দের
বিক্ষোভ সমাবেশে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকের আহ্বানে অংশ নেন শত শত শিক্ষার্থী, তরুণ চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ। ছবি: এএফপি

‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ! বন্দে মাতরম! জয় ভীম!’ —গতকাল শনিবার দুপুরে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে দাঁড়িয়ে এভাবেই স্লোগান দেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত দিপকে। সাধারণত ভারতের তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত এই তিন স্লোগানকে একসঙ্গে উচ্চারণ করে তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন।

গত মে মাসে অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে ককরোচ জনতা পার্টির যাত্রা শুরু। ভারতের প্রধান বিচারপতি দেশটির বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, সেই অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় ভার্চুয়ালি দলটি গড়ে তোলেন দিপকে। পরে এই প্রচারণা মোদি সরকারের সমালোচনায় সরব হয় এবং ৬ জুন দিল্লিতে প্রথম রাজপথের বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেয়।

দিল্লির প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে শত শত মানুষ যন্তর মন্তরে জড়ো হন। তাদের মধ্যে ছিলেন প্রশ্নফাঁসে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী, বামপন্থী কর্মী, তরুণ পেশাজীবী, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ নাগরিক। রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য সেদিন খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। বরং, প্রায় সবাই এক বিষয়ে একমত ছিলেন। তাদের দাবি, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের দায়িত্বকালে ধারাবাহিক প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, তাই তাঁকে এর দায় নিতে হবে।

বিহারের গয়া জেলার ১৬ বছর বয়সী জিনাতও সেই দাবিতেই বিক্ষোভে যোগ দেন। তিনি বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করতে। গত মাসে আমার আগের পরীক্ষার ফল বাতিল হয়ে যাওয়ায় ২১ জুন আমাকে আবারও মেডিকেল স্নাতক ভর্তি পরীক্ষা দিতে হবে।’ তবে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেকের বক্তব্য ছিল, সমস্যা কেবল শিক্ষামন্ত্রীকে ঘিরে নয়। ভারতের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়েও তাদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে। তারা বিশ্বাস করেন না যে পরিস্থিতি নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে।

‘একটা পরীক্ষাও ঠিকমতো নিতে পারে না’

সম্প্রতি বাতিল হওয়া ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (নিট) পরীক্ষার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ২২ লাখ শিক্ষার্থীর একজন জিনাত। তিনি বলেন, ‘আমার খুব মন খারাপ। আমি নিশ্চিত ছিলাম এবার মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে পারব। কিন্তু পরীক্ষাটাই বাতিল হয়ে গেল। দ্বাদশ শ্রেণির ফলও ভালো হয়নি, যদিও আমি ভেবেছিলাম পরীক্ষা ভালো দিয়েছি।’

নিটের প্রস্তুতির জন্য জিনাত দিল্লির মুখার্জি নগরে বড় বোন জয়নাবের সঙ্গে থাকতেন। ওই এলাকা ভর্তি পরীক্ষার কোচিং সেন্টারের জন্য পরিচিত। বিক্ষোভে দুই বোনই তেলাপোকার মুখোশ পরে অংশ নেন। জয়নাব বলেন, ‘ওরা যদি একটা পরীক্ষাও ঠিকভাবে নিতে না পারে, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা করব কীভাবে? নিট পরীক্ষার জন্য আমি ওকে ট্রেনের সাধারণ কামরায় করে বিহারে নিয়ে গিয়েছিলাম, কারণ অন্য কোনো টিকিট পাওয়া যায়নি। দিল্লিতে ফেরার পরই জানতে পারলাম পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর অন্তত পদত্যাগ করা উচিত। তাঁকে দায় স্বীকার করতেই হবে।’

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আরেক শিক্ষার্থী, উত্তর প্রদেশের নয়ডার ১৬ বছর বয়সী আরাভ কেজরিওয়ালও একই ধরনের বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘আমি সরকারের জবাবদিহি দাবি করতে এসেছি।’ দ্বাদশ শ্রেণির এই শিক্ষার্থী সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রশ্নফাঁসের ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘এই ব্যবস্থায় অসংখ্য অসংগতি রয়েছে। কাউকে না কাউকে এর দায় নিতে হবে।’

জেন–জি প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক সাড়া

আরাভ কেজরিওয়াল জানান, বাবা-মায়ের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। সেখানে তিনি ককরোচ জনতা পার্টির লিফলেট বিতরণ করছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি এই উদ্যোগের কথা জানতে পারেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তাদের ছাত্রসংগঠন প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন করলেও কেজরিওয়ালের মতো তরুণদের দৃষ্টি আকর্ষণে খুব একটা সফল হয়নি। ককরোচ প্রচারণা সেই জায়গায় নতুন কিছু করতে পেরেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদের সাবেক সভাপতি এবং গবেষক আইশে ঘোষ বলেন, ‘আমরা বহুদিন ধরেই একই কথা বলে আসছি। কিন্তু কখনো কখনো এমন কিছু ভাষা বা উপস্থাপনা থাকে, যার সঙ্গে মানুষ সহজে সংযোগ স্থাপন করতে পারে।’

২০২০ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার ঘটনায় মাথায় আঘাত পাওয়ার পর জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পাওয়া আইশে ঘোষ শনিবারের বিক্ষোভেও উপস্থিত ছিলেন। তিনি আরও বলেন, ‘ককরোচ জনতা পার্টি যে সাড়া পেয়েছে, আমরা সেটিকে স্বাগত জানাই। এটি তরুণদের গভীর হতাশার প্রতিফলন।’

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী দিব্যাংশীও আন্দোলনের বার্তা ও উপস্থাপনাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘দলটির কোনো নারী মুখপাত্র না থাকাটা আমার ভালো লাগেনি। তবুও সামগ্রিক উপস্থাপনাকে আমি ইতিবাচকভাবে দেখি। আমাদের কাছে এটি নতুন। এর ফল কী হবে জানি না, তবে এমন কিছু দেখতে ভালো লাগে। এ ধরনের বিষয় এখন খুবই বিরল। এটি এক ধরনের বিরল নান্দনিকতা।’

অনেকের জন্যই এটি ছিল জীবনের প্রথম বিক্ষোভে অংশগ্রহণ। তবে কর্মসূচি শুরুর আগে কিছুটা বিশৃঙ্খলাও তৈরি হয়। পুলিশ শেষ পর্যন্ত অনুমতি দেবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। অভিজিত দিপকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর পুলিশ অনুমতি দেয়। ফলে কর্মসূচি এক ঘণ্টার বেশি বিলম্বিত হয়। এ ছাড়া এক্স ও ইনস্টাগ্রামে আয়োজকদের বারবার পরিবর্তিত নির্দেশনাও বিভ্রান্তি বাড়ায়। এতে দিপকে পৌঁছানোর আগেই ঘটনাস্থলে থাকা মুখপাত্রদের ক্ষুব্ধ অংশগ্রহণকারীদের নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে হতাশা

তবে এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তাদের মতে, ভারতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা নিয়ে মানুষের মধ্যে যে হতাশা তৈরি হয়েছে, এই আন্দোলন তারই বহিঃপ্রকাশ। পশ্চিম দিল্লির মোতি নগর থেকে আসা ৪৪ বছর বয়সী ব্যবসায়ী প্রদীপ কুমার বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি কীভাবে আমাদের সন্তানদের তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করতে পারেন? আমরা প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে পুলিশ আমাদের থামানোর চেষ্টা করে। এই ব্যবস্থাই আমাদের তেলাপোকা হতে বাধ্য করছে।’

তাঁর সঙ্গে আসা ৭৫ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত কুলভূষণ টন্ডনও একই ধরনের হতাশার কথা জানান। বিচারব্যবস্থা ও গণমাধ্যম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওরা নিজেদের বিক্রি করে দিয়েছে। পুলিশ, বিচারব্যবস্থা, কেউই কোনো কাজের নয়।’

কিছু অংশগ্রহণকারী ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। ককরোচ জনতা পার্টির ইশতেহারেও কমিশনের বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমের উল্লেখ রয়েছে। দলের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘যদি একটি বৈধ ভোটও মুছে ফেলা হয়, যে রাজ্যেই হোক বা যে দলেরই হোক, তাহলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ইউএপিএ আইনে মামলা করা হবে। কোনো নাগরিককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা অন্য উপায়ে পরিচালিত সন্ত্রাসবাদ।’

বিহারের নালন্দার ২৫ বছর বয়সী ভিকি বর্তমানে দিল্লির করোল বাগ এলাকায় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি মহাত্মা গান্ধীর ছবি-সংবলিত টি-শার্ট পরে এবং হাতে সংবিধানের একটি কপি নিয়ে বিক্ষোভে যোগ দেন। তিনি বলেন, ‘ভারতীয় জনতা পার্টি প্রতারণার মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে। নির্বাচন কমিশন নিজের আত্মা বিক্রি করে দিয়েছে। শিগগিরই বা পরে, আমাদের সবাইকে রাস্তায় নামতেই হবে।’

ভিকির এই মন্তব্য বিহারে বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রসঙ্গে করা।

‘গোদি মিডিয়া গো ব্যাক’

বিক্ষোভে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়ে গণমাধ্যম। বারবার ‘গোদি মিডিয়া গো ব্যাক’ স্লোগান দেওয়া হয়। সরকারপন্থী বলে পরিচিত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে কয়েকজন বিক্ষোভকারীর বাগ্বিতণ্ডাও হয়।

৩৬ বছর বয়সী বিজ্ঞানী দীপ্তি জীবনে প্রথমবারের মতো কোনো বিক্ষোভে অংশ নেন। তাঁর অভিযোগ, এক টেলিভিশন সাংবাদিক তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় ককরোচ আন্দোলনকে খাটো করার চেষ্টা করেন। এমনকি তাঁর বুদ্ধিমত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং তাঁকে নিজের কথা বলার সুযোগ দেননি। দীপ্তি বলেন, ‘ওই সাংবাদিক আমার পুরো অভিজ্ঞতাটাই নষ্ট করে দিয়েছেন। আমি তরুণদের সমস্যার কথা বলতে চেয়েছিলাম। অনেক আশা নিয়ে এখানে এসেছিলাম। কিন্তু নিজের বক্তব্যই তুলে ধরতে পারলাম না।’

গণমাধ্যম সম্পর্কেও ককরোচ জনতা পার্টির ইশতেহারে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া হয়েছে। দলের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘আদানি ও আম্বানির মালিকানাধীন গণমাধ্যমের সম্প্রচার লাইসেন্স বাতিল করা হবে, যাতে প্রকৃত স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের জন্য জায়গা তৈরি হয়। অনুগত টেলিভিশন উপস্থাপকদের ব্যাংক হিসাবও নিরীক্ষা করা হবে।’

যন্তর মন্তরের এই বিক্ষোভে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবির পাশাপাশি ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ এবং গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান অনাস্থাও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন ভবিষ্যতে কতটা রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে শনিবারের এই সমাবেশ অন্তত এটুকু দেখিয়েছে যে দেশের একাংশের তরুণ ও নাগরিকদের মধ্যে বিদ্যমান ক্ষোভ ও হতাশা নতুন ভাষা ও নতুন প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশের পথ খুঁজে পেয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য স্ক্রল থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত