Ajker Patrika

ভারত কি চাইলেই কাউকে বাংলাদেশে পুশ ইন করতে পারে

জগৎপতি বর্মা, ঢাকা
আপডেট : ০৬ জুন ২০২৬, ২১: ২১
ভারত কি চাইলেই কাউকে বাংলাদেশে পুশ ইন করতে পারে
শুক্রবার পঞ্চগড়ের বড়বাড়ি সীমান্তে ১০ জনকে পুশ ইন করে বিএসএফ। এরপর তাঁরা শূন্যরেখায় আটকে খোলা আকাশের নিচে, হাঁটু পানির ওপরে বসে রাত কাটান। ছবি: আজকের পত্রিকা

সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারত থেকে পুশ ইনের ঘটনা ঘটছে। ভারত দাবি করছে, তারা সেখানে অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠাচ্ছে। ঘটনাগুলো খেয়াল করলে দেখা যায়, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ রাতের আঁধারে বা সীমান্তের আলো বন্ধ করে দিয়ে জোর করে কিছু মানুষকে বাংলাদেশে পুশ ইন করছে। এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইন বা দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির লঙ্ঘন।

এদিকে সংশ্লিষ্ট সীমান্তে ভারত থেকে ঠেলে পাঠানো নাগরিকদের বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। দায়িত্বরত কর্মকর্তারাও বলছেন, এভাবে পুশ ইন করা বেআইনি। কারণ, প্রত্যাবাসনের নির্দিষ্ট নিয়ম আছে।

প্রতিবেশী দুই দেশের সীমান্তে এই সংকটময় পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—চাইলেই কোনো দেশ এভাবে ‘পুশ ইন’ করতে পারে? যদি না পারে, সে ক্ষেত্রে বৈধভাবে নাগরিক স্থানান্তরের প্রক্রিয়াই-বা কী?

সহজ কথায় বলতে গেলে, না। ভারত চাইলেই একতরফাভাবে বা জোরপূর্বক যে কাউকে বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ বা ফেরত পাঠাতে পারে না। ভারতে যদি কোনো বিদেশি বা বাংলাদেশি অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে বা বসবাস করে, তবে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ভারতের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ আইন রয়েছে। তবে আইনগতভাবে কাউকে অবৈধ চিহ্নিত করার অর্থ এই নয় যে তাঁকে সরাসরি সীমান্ত পার করে দেওয়া যাবে। এর জন্য দুই দেশের মধ্যে সুনির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা এবং দ্বিপক্ষীয় কার্যপদ্ধতিও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন (১৯৫১ সালের শরণার্থী সনদ) অনুযায়ী, ‘রাষ্ট্রসমূহ কোনো ব্যক্তিকে এমন কোনো ভূখণ্ডে ফেরত পাঠাতে পারে না, যেখানে তাঁর জীবন বা স্বাধীনতা হুমকির সম্মুখীন হবে।’

কিন্তু গত দুই দিনে ভারত যতজনকে (নারী-শিশুসহ) পুশ ইন করেছে, তাঁরা সবাই শূন্যরেখায় আটকে ছিলেন। এসব মানুষ না বাংলাদেশে যেতে পেরেছে, না ভারতে ফিরতে পেরেছে। প্রায় ২৫-৩০ ঘণ্টা ধরে অনেকেই শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নিচে, হাঁটুপানিতে বসে রাত কাটিয়েছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।

এদিকে গতকাল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সীমান্তের এ বিষয়টি উঠে আসে। সেখানে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘এই কার্যক্রমের জন্য দুই দেশের মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় কার্যপদ্ধতি চালু রয়েছে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অর্থাৎ ভারত যদি কাউকে তাদের দেশে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করে, তবে বাংলাদেশের সঙ্গে সমন্বয় করেই তাঁকে ফেরত পাঠাতে হবে। জোর করে বা সীমান্তের লাইট বন্ধ করে একপক্ষীয় পুশ ইন সম্পূর্ণ অবৈধ ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।

অবৈধ নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর নিয়ম

কাউকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো বা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো আছে, যা বেশ কিছু নিয়মের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।

এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাতীয়তা বা নাগরিকত্ব যাচাই। কোনো ব্যক্তিকে অবৈধ বাংলাদেশি হিসেবে সন্দেহ করা হলে ভারত প্রথমেই সেই ব্যক্তির নাম ও নথিপত্র বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠায়। বাংলাদেশ সরকার যখন নিজস্ব তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করে যে ওই ব্যক্তি আসলেই বাংলাদেশের নাগরিক (জাতীয়তা ভেরিফায়েড), কেবল তখনই ভারত তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আইনি প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত করতে পারে।

বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া কাউকেই পুশ ইন করা সম্ভব নয়। আর যদি করাও হয়, তবে আন্তর্জাতিক বা দ্বিপক্ষীয় নিয়ম অনুযায়ী সেটা বৈধ হবে না।

বাংলাদেশ ও ভারতের প্রত্যর্পণ চুক্তি যা বলে

সাধারণ পুশ ইন বা অবৈধ নাগরিক ফেরত পাঠানোর বাইরে দুই দেশের মধ্যে অপরাধী বা বন্দী হস্তান্তরের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে হওয়া এই চুক্তির বিস্তারিত তথ্য ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের ওয়েবসাইটে রয়েছে।

২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে বন্দিবিনিময় সহজ করতে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৫ সালে এই চুক্তির আওতায় ভারতের আসামের উলফা নেতা অনুপ চেটিয়া এবং বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুন মামলার আসামি নূর হোসেনকে পারস্পরিক হস্তান্তর করা হয়েছিল।

২০১৩ সালের এই মূল চুক্তিতে মোট ১২টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এর প্রধান শর্ত ও নিয়মগুলো নিচে দেওয়া হলো—

১ ও ২ অনুচ্ছেদ (অপরাধের মাত্রা): বিচারিক কর্তৃপক্ষের দ্বারা বিচারাধীন, অভিযুক্ত, দোষী সাব্যস্ত বা দণ্ড কার্যকরের জন্য যাদের খোঁজ চলছে, সেই ব্যক্তিদের রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পাওয়া গেলে প্রত্যর্পণ করতে হবে। তবে অপরাধটি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের আইনে ন্যূনতম এক বছরের কারাদণ্ডযোগ্য হতে হবে।

দ্বৈত অপরাধের নীতি: যে ব্যক্তির প্রত্যর্পণ বা হস্তান্তর চাওয়া হচ্ছে, তাঁর অপরাধটি উভয় দেশের আইনেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে হবে।

বিশিষ্টতার নীতি: অপরাধীকে যে নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট দেশে তাঁকে কেবল সেই নির্দিষ্ট অপরাধের জন্যই বিচার করা যাবে; অন্য কোনো পুরোনো মামলায় জড়ানো যাবে না।

৬ অনুচ্ছেদ (রাজনৈতিক অপরাধের অব্যাহতি): কোনো ব্যক্তি যদি রাজনৈতিক কারণে অভিযুক্ত বা রাজনৈতিক মামলার আসামি হন, তবে সাধারণত এই চুক্তির আওতায় তাঁকে অন্য দেশের হাতে হস্তান্তর করা হয় না। তবে হত্যা, হত্যার প্ররোচনা, অপহরণ, বেআইনিভাবে জিম্মি করাসহ ১৩ ধরনের অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।

৮ অনুচ্ছেদ (প্রত্যর্পণ না করার ভিত্তি): যাঁকে ফেরত চাওয়া হচ্ছে তিনি যদি অপরাধের মাত্রা, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সময় কিংবা অভিযোগটি ন্যায়বিচারের স্বার্থে আনা হয়নি—এসব বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেন, তবে আশ্রয় দেওয়া রাষ্ট্র তাঁকে প্রত্যর্পণ করতে বাধ্য নয়।

আবেদন ও আইনি প্রক্রিয়া: অপরাধীকে ফেরত পেতে এক দেশ অন্য দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক আবেদন করে। এরপর সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত বা কর্তৃপক্ষ আবেদনের পক্ষে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ আছে কি না, তা যাচাই-বাছাই করে। আদালত সন্তুষ্ট হলেই কেবল সরকার ওই ব্যক্তিকে হস্তান্তরের চূড়ান্ত আদেশ দেয়।

২০১৬ সালের সংশোধনী: পলাতক অপরাধীদের দ্রুত প্রত্যর্পণ

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির অনুচ্ছেদ ১০-এর ৩ নম্বর ধারাটি সংশোধন করা হয়। পলাতক অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে হস্তান্তর নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই সংশোধন আনা হয়েছিল।

মূল চুক্তির এই ধারায় উল্লেখ ছিল, প্রত্যর্পণ চাওয়ার ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণও জমা দিতে হবে। তবে সংশোধনী অনুযায়ী প্রক্রিয়াটি সহজ করা হয়, এখন থেকে শুধু বৈধ পরোয়ানা থাকলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হবে।

সামগ্রিক আইনি কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণ অভিবাসী বা সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে ভারত একতরফাভাবে পুশ ইন করতে পারে না। এর জন্য বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিশ্চিতকরণ (ভেরিফিকেশন) প্রক্রিয়া আবশ্যক। আর দাগি বা চিহ্নিত পলাতক অপরাধীদের ক্ষেত্রে দুই দেশের সরকার ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির (২০১৬ সালের সংশোধনীসহ) আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্দিবিনিময় করে থাকে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত