
ইসরায়েল ও লেবানন গত বুধবার আবারও যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে। অথচ এর আগে ১৬ এপ্রিল উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। একইভাবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ৮ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। আর গাজায় ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের মধ্যে ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি বলবৎ রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও সংঘর্ষ, বিমান হামলা ও প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধবিরতি আসলে কতটা কার্যকর? আন্তর্জাতিক আইন এ বিষয়ে কী বলে? আর যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পরও কেন দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায় না?
লেবাননে ইসরায়েলের হামলা থেমে নেই। শুক্রবার দক্ষিণ লেবাননের নাকৌরা ও নাবাতিয়েহ জেলায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত একজন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এসব হামলার তীব্রতা আরও বেড়েছে। একই সময়ে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইনের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। তেহরানের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতির সময় যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী হামলায় এসব উপসাগরীয় দেশ সহযোগিতা করেছে।
গাজাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলি বাহিনী বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। চলতি সপ্তাহে একটি আবাসিক ভবনে হামলায় ৯ জন নিহত হয়েছেন। যদিও যুদ্ধবিরতির উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের চলমান গণহত্যামূলক যুদ্ধের অবসান ঘটানো।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব দ্য ফ্রেজার ভ্যালির অপরাধ বিচার ও অপরাধ তত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মার্ক কার্স্টেনের মতে, যুদ্ধবিরতি হলো সংঘর্ষ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা, যাতে আলোচনার জন্য সুযোগ সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতি মূলত শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার ব্যবস্থা, তবে এটিকে সাধারণত স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখা হয় না।
কানাডার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মাইকেল লিংকের মতে, যুদ্ধবিরতি অনেক ক্ষেত্রে শক্তিশালী আইনি দলিলের চেয়ে রাজনৈতিক চুক্তি হিসেবে বেশি কার্যকর। তাঁর ভাষায়, শান্তিচুক্তির ক্ষেত্রে সাধারণত গ্যারান্টিদাতা বা তদারককারী পক্ষ থাকে, যারা চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু যুদ্ধবিরতি সহজে লঙ্ঘিত হতে পারে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর তাৎক্ষণিক আইনি পরিণতি দেখা যায় না।
বিশেষ করে গাজা ও লেবাননের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতাকারী ও তদারককারী হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। যদিও কিছু দেশ লেবাননে ইসরায়েলি হামলার সমালোচনা করেছে, তবু ইসরায়েলকে বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের সুযোগ দেওয়ার জন্য ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি হয়নি। লিংক বলেন, গ্লোবাল নর্থ, অর্থাৎ উন্নত বিশ্বের কয়েকটি দেশ লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার সমালোচনা করলেও গাজা ও লেবাননে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের সুযোগ দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেনি।
ব্রিটিশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী এবং গোয়ের্নিকা-৩৭ চেম্বার্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা টবি ক্যাডম্যানের মতে, যুদ্ধবিরতি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। তবে তাঁর মতে, যুদ্ধবিরতি স্বভাবগতভাবে নাজুক। কারণ, এটি কেবল সামরিক অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখে, কিন্তু মূল সংঘাতের সমাধান করে না এবং যুদ্ধের আইনি অবস্থারও অবসান ঘটায় না। তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতি লড়াই বন্ধ করে, কিন্তু সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটায় না।
মাইকেল লিংকের মতে, যুদ্ধবিরতির সঙ্গে যদি বিস্তৃত শান্তি পরিকল্পনা যুক্ত থাকে, তাহলে তা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ভিত্তি পায়। গাজার ক্ষেত্রে এমন একটি শান্তি পরিকল্পনা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়েছে। সেখানে চুক্তি সম্পূর্ণভাবে, সদিচ্ছার সঙ্গে এবং বিলম্ব ছাড়া বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।
তাত্ত্বিকভাবে কোনো রাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদের কাছে অভিযোগ জানিয়ে চুক্তি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চাইতে পারে। কিন্তু বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতার কারণে ইসরায়েল কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। লিংকের ভাষায়, যুদ্ধবিরতি ও শান্তিচুক্তি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলিল। কারণ, এগুলো বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
গাজার ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনিরা বারবার অভিযোগ করেছে যে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরকে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ করে। ইসরায়েল ও লেবাননের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি দেখা যায়। টবি ক্যাডম্যানের মতে, এমন কোনো নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ নেই, যার বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে যে কোন পক্ষ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।
যদিও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে, সেগুলো সাধারণত সেই দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকে, যারা যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করেছে এবং গ্যারান্টিদাতা হিসেবে কাজ করছে। গাজা ও লেবাননের ক্ষেত্রে এই ভূমিকা পালন করছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী, গ্যারান্টিদাতা এবং ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সামরিক ও কূটনৈতিক মিত্র। ফলে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ অনেক সময় স্বাধীন আইনি মূল্যায়নের বদলে রাজনৈতিক বিবেচনায় বিচার করা হয়।
মার্ক কার্স্টেনের মতে, গাজা ও লেবাননের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার একটি মৌলিক বৈপরীত্যকে সামনে এনেছে। তিনি বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশ স্বীকার করে যে এসব অঞ্চলে যা ঘটছে তা শুধু ভুল নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বেআইনি।
তবে এই স্বীকৃতি সহিংসতা থামাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। কার্স্টেনের ভাষায়, মানুষের জীবন রক্ষা এবং হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে খুব কমই করা হচ্ছে।
ফলে আইনি সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক পদক্ষেপের মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ কিংবা রায় দিতে পারে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ বোমা হামলা বন্ধ করতে পারে না কিংবা মাঠপর্যায়ে আইন বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দেয় না।
কার্স্টেন ও লিংকের মতে, সমস্যা আন্তর্জাতিক আইনের নিয়মে নয়; বরং শক্তিধর রাষ্ট্র জড়িত থাকলে সেই আইন কার্যকর করতে রাষ্ট্রগুলোর অনীহাই সবচেয়ে বড় বাধা। লিংক বলেন, কার্যকর জবাবদিহির অভাবই আন্তর্জাতিক আইন এবং আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
তবে কার্স্টেন জোর দিয়ে বলেন, যুদ্ধবিরতির সময়ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন, মানবাধিকার আইন এবং আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইন পুরোপুরি কার্যকর থাকে। তাঁর মতে, যুদ্ধবিরতি বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে নৃশংসতা চালানোর কোনো আইনি বৈধতা দেয় না। ফলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তদন্ত ও বিচার করা সম্ভব।
টবি ক্যাডম্যানের মতে, গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত আইনি যুক্তি হলো আত্মরক্ষার অধিকার। এই যুক্তির ভিত্তি জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ, যেখানে আত্মরক্ষার প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে।
তবে ক্যাডম্যান বলেন, এই অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। তাঁর মতে, ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ কেবল ইতিমধ্যে সংঘটিত বা অত্যন্ত সন্নিকট কোনো সশস্ত্র হামলার জবাব দেওয়ার সুযোগ দেয়। এটি প্রতিরোধমূলক হামলা চালানোর স্থায়ী অনুমতি নয়।
বুধবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, বিশ্বের ওই অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি মানে হলো ‘আপনি আরও সংযতভাবে গুলি করছেন।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মন্তব্যই বর্তমান বাস্তবতার প্রতিফলন। গাজা, লেবানন ও উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সহিংসতার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো কার্যকর বাস্তবায়ন ব্যবস্থার অভাব। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ভেটো ক্ষমতার কারণে সীমাবদ্ধ। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বাধ্যতামূলক আদেশ দিতে পারলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারলেও তা কার্যকর করতে রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার প্রয়োজন হয়।
ক্যাডম্যানের ভাষায়, সব ক্ষেত্রেই মূল সমস্যা হলো বাস্তবায়নের ঘাটতি। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক আইনের নিয়মের অভাব নেই। কিন্তু সেসব নিয়ম প্রায়ই বেছে বেছে প্রয়োগ করা হয়। তিনি বলেন, আইন আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আলাদা নয়, কিন্তু এর প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচিত ও পক্ষপাতমূলক।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। এই সংঘাত শুধু সামরিক লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ইরানের প্রতিরক্ষা নীতি, আঞ্চলিক প্রভাব এবং উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামো সম্পর্কেও নতুন বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে।
১৬ মিনিট আগে
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা যুদ্ধ চার মাসে পদার্পণ করেছে। শান্তি আলোচনা নিয়ে দুই পক্ষ এখনো অচলাবস্থায়। এর মধ্যেই ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা কমানোর পক্ষে ভোট দিয়েছে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ।
২ দিন আগে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা ইঙ্গিত দিচ্ছে, দুই পক্ষের মধ্যে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে এখনো বেশ দূরের পথ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি কোনো চুক্তি হয়ও, তবুও ইরানের এই নতুন ‘জ্বালানি অস্ত্র’ কেড়ে নেওয়া হয়তো সম্ভব হবে না।
২ দিন আগে
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত অংশীদারত্বের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান ক্রমেই ভারতের আঞ্চলিক স্বার্থের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে।
২ দিন আগে