Ajker Patrika

টিম মার্শালের নিবন্ধ

ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন নয়: ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রটি অন্য কিছু

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২০ মার্চ ২০২৬, ১২: ৩৮
ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন নয়: ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রটি অন্য কিছু
হরমুজ প্রণালি। ছবি: সংগৃহীত

ইরাকের মরুভূমি আর আফগানিস্তানের পাহাড় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে শিখিয়েছিল, আপনার সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, অস্ত্র থাকতে পারে, কিন্তু যুদ্ধে শেষ কথাটা প্রকৃতপক্ষে ভূগোলই বলে। বহু বছর পর ইরানের উপকূলঘেঁষা জলরাশিও এখন সেই একই পাঠ দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরানের তুরুপের তাস কী? স্ট্রেইট অব হরমুজ বা হরমুজ প্রণালি। তেহরান সেটি ব্যবহারও করেছে। তারা কার্যত সেই জলপথ বন্ধ করে দিয়েছে, যার মাধ্যমে বিশ্বে ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়।

প্রণালিতে জাহাজে হামলা আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ হতে পারে, কিন্তু ইরান বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিল যে তারা এমনটি করবে। ২০১৮ সালে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর তৎকালীন কমান্ডার মোহাম্মদ আলী জাফরি বলেছিলেন, ‘আমরা শত্রুকে বোঝাব, হয় সবাই হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করবে, নয়তো কেউই করবে না।’

এই প্রণালি কুয়েত, ইরাক, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির একমাত্র সমুদ্রপথ। এই প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

এটি অতিক্রম করার পর তেলবাহী জাহাজগুলো পূর্ব দিকে চীন, ভারত ও জাপানের দিকে যায় অথবা ডান দিকে ঘুরে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল অভিমুখে চলে ইউরোপ-আমেরিকা কিংবা উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে যায়। এমনকি এই পথে এশিয়ার একেবারে পশ্চিম অংশের কিছু দেশ—ইসরায়েল, লেবানন, সিরিয়া এবং তুরস্কেও যাওয়া যায়।

এই প্রণালির ভূগোলই ইরানকে বিশ্বের অর্থনীতিকে জিম্মি করার ক্ষমতা দিয়েছে। এর সরু অবস্থা, অগভীর পানি ও লুকানো খাড়িগুলো সহজে মাইন বা বিস্ফোরকবোঝাই দ্রুতগতির নৌকা আড়াল করতে পারে এবং ট্যাংকারের নাবিকেরা তা ভালো করেই জানে।

আর এ কারণেই ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়েও এটি ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশটি হলো ওমানের মুসান্দাম পেনিনসুলা এবং ইরানের বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের মাঝের ২৪ মাইল পথ। এখানে ট্যাংকার চলাচলের জন্য ছয় মাইল চওড়া একটি চ্যানেল ব্যবহৃত হয়, দুই দিকেই দুই মাইল করে লেন এবং মাঝখানে দুই মাইলের একটি বাফার জোন।

এই করিডরের বেশির ভাগ অংশ ওমানের জলসীমায়, যেখানে পানি গভীর। কিন্তু ইরানের উপকূলের কাছে এলেই তা অগভীর হয়ে যায়। কোথাও কোথাও গভীরতা ৫০ ফুটেরও কম। এই জলরাশি বহু সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন দেখেছে, কিন্তু একটি বিষয় স্থায়ী, টেকসইভাবে থেকে গেছে: পারস্য।

আকিমেনিদ সাম্রাজ্য যখন তার শিখরে (খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫০-৩৩০), তখন রোমানরা এই সংকীর্ণ জলপথকে লাতিনে ‘সাইনাস পারসিকাস’ নামে চিনত। ওসমানী সাম্রাজ্যের মানচিত্রে এর নাম ছিল বাহর-ই-ফারস, অর্থাৎ পারস্যের সাগর।

পারস্য উপকূল ও তার দ্বীপগুলো সমুদ্রকেন্দ্রিক ঐতিহ্যে গড়ে উঠেছে, যেমন ঢাউ নৌকা নির্মাণ, পাল তৈরির কাজ, মাছ ধরা ও মুক্তা আহরণ। ১৯০৮ সালে তেল আবিষ্কারের পরও কিছু ঐতিহ্য টিকে ছিল। এখনো কোথাও কোথাও হাতে নৌকা ও জাল তৈরি হয়, যদিও মাছ ধরার শিল্প এখন মূলত বড় প্রতিষ্ঠানের দখলে।

আজ উপকূলের সরু সমভূমিতে ছড়িয়ে থাকা শত শত গ্রামের খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘরগুলোকে তেলশিল্পের সুউচ্চ স্থাপনার সঙ্গে স্থান ভাগাভাগি করে নিতে হচ্ছে। ভূপ্রকৃতি ও আবহাওয়ার কারণে ইরানের উপকূলটি কম জনবসতিপূর্ণ। জাগরোস পর্বতমালার দীর্ঘ অংশজুড়ে বিস্তৃত এবং অনেক জায়গায় সমুদ্র সরাসরি খাড়া পাথুরে পাহাড়ি দেয়ালে গিয়ে ঠেকেছে। ফলে উপকূলীয় বসতিগুলোকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করা কঠিন হয়েছে।

তাই ইরানের ১০টি বৃহত্তম শহরের একটিও এই উপকূলে নয়। প্রায় ৪০ লাখ জনসংখ্যার দুবাইয়ের মতো কোনো মহানগর এখানে নেই। ইরানের সবচেয়ে বড় শহর বন্দর আব্বাসের জনসংখ্যা প্রায় ৫ লাখ ২৬ হাজার। কর্মসংস্থানের কারণে এখানে নানা সংস্কৃতির মানুষ এসেছে। প্রধান গোষ্ঠী পারসিক, বান্দারি ও বালুচ; শেষোক্ত ব্যক্তিরা এসেছে পাশের বালুচিস্তান অঞ্চল থেকে।

এখানে মূল ভাষা বান্দারি, যা ফারসি বা পারসিয়ানের একটি উপভাষা। উত্তরে বুশেহর অঞ্চলে পারস্য ও আরবদের মিশ্র বসতি, আরও উত্তরে লুর জনগোষ্ঠী, আর উপসাগরের মাথায়, যেখানে ইরান ইরাকের সঙ্গে মিলেছে, সেখানে আরবরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।

তাদের সবার মিল একটি বিষয়: তারা সবাই ইরানি এবং দেশের দরিদ্রতম ও তেলশিল্প ছাড়া সবচেয়ে অনুন্নত অঞ্চলের একটিতে বাস করে। এই জনগোষ্ঠী এককভাবে সরকারপন্থী বা বিরোধী নয়, তবে গত কয়েক দশকে কিছু বালুচ ও আরব গোষ্ঠী অস্ত্র তুলে নিয়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে কয়েকটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ রয়েছে, যার মধ্যে হরমুজ দ্বীপ অন্যতম। সবগুলোতেই ইরানি সামরিক উপস্থিতি আছে এবং কেশম খারগ দ্বীপে বিপুল অস্ত্রভান্ডার রয়েছে।

সবচেয়ে বড় কেশম দ্বীপ (৫৫৮ বর্গমাইল) প্রণালির মুখ নিয়ন্ত্রণ করে এবং এখানে প্রায় দেড় লাখ মানুষ বাস করে, অধিকাংশই বান্দারি ভাষাভাষী সুন্নি মুসলিম। এটি ম্যানগ্রোভ বনের জন্য বিখ্যাত, কিন্তু এখন আগ্রহের বিষয় এর ভূগর্ভ।

দ্বীপের গুহা ও সুড়ঙ্গে ইরান একটি ‘মিসাইল সিটি’ বা ক্ষেপণাস্ত্রের শহর নির্মাণ করেছে। এই শহরে শত শত দ্রুতগতির নৌকা ও ক্ষেপণাস্ত্র লুকানো আছে। কিছু সরানো হলেও অনেক এখনো সেখানে রয়ে গেছে।

দ্বীপটির সামরিক ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৬২১ সালে পর্তুগিজরা এখানে পাথরের দুর্গ বানায়, পরে ঊনবিংশ শতকে ব্রিটিশরা এটিকে নৌঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। যদি মার্কিন মেরিন সেনা স্থলযুদ্ধে নামে, তবে তাদের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে এই দ্বীপ। অন্যদিকে খারগ দ্বীপ ইরানের তেল রপ্তানির কেন্দ্র। এর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে, কিন্তু পাইপলাইন অক্ষত। স্থলবাহিনী ব্যবহৃত হলে এটিও সম্ভাব্য লক্ষ্য।

এই ভূগোল ব্যবহার করেই ইরান শিপিং বিমার খরচ আকাশছোঁয়া করে তুলছে এবং সঙ্গে বাড়ছে তেল-গ্যাসের দাম। খাদ্যের দামও বাড়তে পারে, কারণ বিশ্বে সার তৈরির কাঁচামালের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই পথ দিয়ে যায়।

যুদ্ধ থামলে দ্রুত দাম কমতে পারে, তবে যদি চ্যানেলে মাইন পাতা থাকে, তাহলে পরিস্থিতি বিপজ্জনকই থাকবে। নিশ্চিত নয় এমন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত এক ডজন মাইন পাতা হয়েছে। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। ইরানের কাছে বিভিন্ন ধরনের মাইন রয়েছে। এর মধ্যে এমন কিছু মাইন আছে যা জাহাজের ওজন বোঝার জন্য পানির চাপের পরিবর্তন মাপতে সক্ষম। প্রণালিটি এত সরু যে অল্প এলাকায় মাইন পাতলেই চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়বে।

মাইন অপসারণ করা একটি বিকল্প, কিন্তু যুদ্ধের সময় এটি শান্তিকালের তুলনায় অনেক কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র ট্যাংকারকে যুদ্ধজাহাজ দিয়ে পাহারা দেওয়ার ধারণাও তুলেছে, যা সম্ভব হলেও ঝুঁকিপূর্ণ এবং আইনি জটিলতা রয়েছে।

ইরানের আশপাশের ভূগোল আর রক্ষকের পক্ষে। এমনকি পানিও তাদের পক্ষে কাজ করে, উচ্চ লবণাক্ত পানি যুদ্ধজাহাজের গায়ে দ্রুত ক্ষয় সৃষ্টি করে, ফলে দীর্ঘ সময় সর্বোচ্চ সক্ষমতা বজায় রাখা কঠিন হয়।

মুসান্দাম পেনিনসুলাকে কখনো কখনো আরবের নরওয়ে বলা হয় এবং ইরানের উপকূলের কিছু অংশও তেমন খাড়া পাথুরে দেয়াল ও ফিয়র্ডসদৃশ উপসাগরপূর্ণ, ফারসিতে যাকে আব-দারেহ বা ‘জল উপত্যকা’ বলা হয়।

এই উপকূলের যেকোনো লুকানো জায়গা থেকে বিস্ফোরকবোঝাই দ্রুতগতির নৌকা এবং পানির ওপর ও নিচের ড্রোন বেরিয়ে আসতে পারে। প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় খুব কম থাকবে। কারণ, বহর থাকবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের কয়েক মাইলের মধ্যেই। বন্দর আব্বাসের সংলগ্ন পাথুরে ঢালে ইরান জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি তৈরি করেছে।

একটি ট্যাংকার বহর সামনে মাইন অপসারণকারী ধীরগতির জাহাজ নিয়ে এগোলে তাদের সামনে থাকতে পারে মাইন, উপকূল থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ ও পানির ড্রোন, ক্ষুদ্র সাবমেরিন এবং বিস্ফোরকবোঝাই দ্রুত নৌকা বা এমনকি মাছ ধরার ট্রলারও। এর বিরুদ্ধে টিকে থাকতে হলে ২৪ ঘণ্টা বিমান ও হেলিকপ্টারের আকাশ পাহারা এবং অবিরাম নজরদারি দরকার।

১০টি ট্যাংকারের একটি বহর পাহারা দিতে অন্তত পাঁচটি যুদ্ধজাহাজ লাগবে। তবু বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ব্যবস্থায় যুদ্ধপূর্ব সময়ের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ তেলই পরিবহন করা সম্ভব হবে। আইনি সমস্যা হলো, সমুদ্র আইনে বহরের জাতীয়তা নির্ধারিত হয় পাহারাদার যুদ্ধজাহাজের জাতীয়তার ভিত্তিতে। ফলে কোনো যুদ্ধে জড়িত দেশের পাহারায় থাকা বাণিজ্যিক জাহাজকে বৈধ সামরিক লক্ষ্য হিসেবে দাবি করা যেতে পারে।

ইরানের আরেকটি ভৌগোলিক তাস রয়েছে—বাব এল-মান্দেব বা ‘গেট অব টিয়ার্স’ প্রণালি। এটি গালফ অব এডেন বা এডেন উপসাগরকে লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় রয়েছে। এই হুটিরা আবার ইরানের মিত্র। এই পথ বন্ধ হলে হরমুজের মতো এখানেও একই ধরনের পাহারাদার যুদ্ধজাহাজের বহর ব্যবস্থা লাগবে।

প্রচলিত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তুলনায় বহুগুণ শক্তিশালী, কিন্তু ইরান প্রচলিত যুদ্ধ চায় না। তারা অ্যাসিমেট্রিক যুদ্ধের কৌশল নিচ্ছে, যাতে রাশিয়া ও চীন বিশ্বাস করে যে তেহরান দীর্ঘ যুদ্ধ চালাতে পারবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্ররা ওয়াশিংটনকে চাপ দেবে সরে দাঁড়াতে এবং পশ্চিমা বিশ্বে বিভাজন তৈরি হয়।

পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীও থাকতে পারে, কিন্তু তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে প্রকৃতি নিজেই। তাই এটি আশ্চর্যের কিছু নয় যে—প্রাচীন অ্যাসিরীয়রা পারস্য উপসাগরকে এ কারণেই বলত ‘তিক্ত সাগর।’

টেলিগ্রাফ ইউকে থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

‘যুদ্ধের ব্যাপারে যদি আগে জানতাম, তাহলে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলতাম’

ইরান এই যুদ্ধে হারবে না, ভারতের উচিত পাশে থাকা: সাবেক ‘র’ প্রধান

ইরানের আকাশে ক্ষতিগ্রস্ত যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ মিলিয়ন ডলারের যুদ্ধবিমান

ইসরায়েলের বৃহত্তম তেল শোধনাগারে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

‘আরটির সাংবাদিকদের ওপর ইসরায়েলি হামলা পরিকল্পিত’, কড়া প্রতিক্রিয়া রাশিয়ার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত