Ajker Patrika

চীনে ইলন মাস্ক ‘ভিলেন’ নাকি দূরদর্শী নায়ক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
চীনে ইলন মাস্ক ‘ভিলেন’ নাকি দূরদর্শী নায়ক
বেইজিং-এর গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ ট্রাম্পের জন্য আয়োজিত একটি অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইলন মাস্ক। ছবি: এএফপি

চীনে ইলন মাস্ককে একদিকে যেমন প্রযুক্তি জগতের দূরদর্শী উদ্যোক্তা হিসেবে দেখা হয়, অন্যদিকে বিভিন্ন বিতর্ক ও সমালোচনার কারণেও তাঁকে ঘিরে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। টেসলার প্রধান নির্বাহী মাস্ক কখনো চীনা জনগণের প্রশংসা পেয়েছেন, আবার কখনো গ্রাহক অভিযোগ ও নিরাপত্তা ইস্যুতে তীব্র সমালোচনার মুখেও পড়েছেন।

বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বেইজিং সফরে থাকা শীর্ষ মার্কিন করপোরেট প্রতিনিধিদলের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন মাস্ক। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন অ্যাপলের টিম কুক ও এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াংয়ের মতো প্রযুক্তি জগতের বড় বড় নেতা। বেইজিংয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মাস্ক বলেন, তিনি চীনের সঙ্গে ‘অনেক ভালো কাজ’ করতে চান।

চীনে মাস্কের জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ হলো, তাঁর ব্যবসায়িক আগ্রহের সঙ্গে বেইজিংয়ের প্রযুক্তিগত অগ্রাধিকারের বিস্ময়কর মিল রয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মানবাকৃতির রোবট, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস—এসব খাতেই চীন ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষেত্রগুলোতেই মাস্ক দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ২০১৮ সালে টেসলাই ছিল প্রথম বিদেশি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, যাকে স্থানীয় কোনো অংশীদার ছাড়াই চীনে উৎপাদন কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। গত বছর চীনে টেসলা প্রায় ৬ লাখ ২৬ হাজার গাড়ি বিক্রি করেছে, যা দেশটির বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে প্রতিষ্ঠানটিকে অন্যতম বড় খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে। টেসলার মোট আয়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই এসেছে চীন থেকে।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতারা দ্রুত এগিয়ে আসছে। শাওমি, চেরি ও বিওয়াইডি-এর মতো প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তি ও দামের প্রতিযোগিতায় টেসলাকে চাপে ফেলছে। চীনে ট্রাম্পের সঙ্গী হয়ে চলমান সফরে শাওমির প্রধান নির্বাহী লেই জুনের সঙ্গে মাস্কের একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ভোজের আগে লেই জুন মাস্কের সঙ্গে সেলফি তুলতে চাইলে মাস্কের কিছুটা বিরক্ত মুখভঙ্গি নিয়ে চীনা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক হাস্যরস তৈরি হয়।

মাস্কের আরেকটি বড় শক্তি তাঁর স্পেসএক্স মহাকাশ সংস্থা এবং স্টারলিংক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক। কিন্তু এই দুটি আবার চীনের সামরিক ও কূটনৈতিক মহলে উদ্বেগের কারণ। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় স্টারলিংকের কার্যকারিতা দেখে বেইজিং আশঙ্কা করছে, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য এশীয় সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রযুক্তি আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে পারে। ফলে চীন নিজস্ব বিকল্প স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা জোরদার করেছে।

চীনে একসময় মাস্ককে ‘গ্লোবাল আইডল’, ‘প্রযুক্তির পথিকৃৎ’ এবং ‘ভাই মা’ নামে অভিহিত করা হতো। তাঁর মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স চীনে নিষিদ্ধ হলেও চীনা প্ল্যাটফর্ম ওয়েইবোতে তাঁর প্রায় ২৩ লাখ অনুসারী রয়েছে। এমনকি মাস্কের মা মেই মাস্কও চীনে এক ধরনের সেলিব্রিটি হয়ে উঠেছেন।

তবে বিতর্কও কম নয়। ২০২১ সালে ব্রেকের ত্রুটি নিয়ে এক গ্রাহকের অভিযোগ যথাসময়ে সমাধান না করায় টেসলাকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল। একই বছর নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে চীনের সামরিক এলাকাগুলোতে টেসলা গাড়ি প্রবেশও নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ২০২৪ সালে মাস্কের চীন সফরের পর সেই নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনে মাস্কের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন দেশটির নিজস্ব প্রযুক্তি ও গাড়ি শিল্পের উত্থান। স্থানীয় কোম্পানিগুলো প্রযুক্তিগতভাবে টেসলার সমকক্ষ হয়ে উঠলে মাস্কের ব্যক্তিগত প্রভাব ও জনপ্রিয়তাও ধীরে ধীরে কমতে পারে। তবুও প্রযুক্তি জগতে তাঁর অবদান ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে চীনের অনেক মানুষের কাছে তিনি এখনো এক অনন্য প্রতীক।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত