Ajker Patrika

আল-জাজিরার বিশ্লেষণ /আলোচনার টেবিলে শক্ত অবস্থানে কে—ইরান না যুক্তরাষ্ট্র?

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২: ২৩
আলোচনার টেবিলে শক্ত অবস্থানে কে—ইরান না যুক্তরাষ্ট্র?
আলোচনার টেবিলে ইরানই আপাতত এগিয়ে আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে ‘গঠনমূলক’ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রকাশ্যে ইরানি কর্মকর্তারা ট্রাম্পের এই দাবি নাকচ করে এটিকে তেলের দাম কমানো এবং বিশ্লেষকেরা এটিকে ‘সময়ক্ষেপণের’ উদ্দেশ্যে ছড়ানো ভুয়া খবর বলে অভিহিত করেছেন।

পর্দার আড়ালে গত কয়েক দিনে মিসর, তুরস্ক এবং পাকিস্তান মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি পরোক্ষ যোগাযোগের চ্যানেল স্থাপন করেছে বলে অঞ্চলের দুই জ্যেষ্ঠ কূটনৈতিক সূত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছে। তবু কূটনীতির একটি ছোট সুযোগ তৈরি হয়ে থাকলেও যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সন্দিহান। কারণ, যুদ্ধে লিপ্ত পক্ষগুলোর অবস্থান শান্তি স্থাপন থেকে এখনো অনেক দূরে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালিয়ে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করার পর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কী ধরনের ছাড় আদায় করা হবে, সে বিষয়ে ইরানের নেতৃত্বের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের দাবি, তাদের টানা হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ‘ক্ষয়ে’ গেছে। পেন্টাগনের ভাষ্য, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার ৯০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু ইরান দেখিয়েছে, তারা চাইলে এখনো নির্ভুলভাবে হামলা চালাতে সক্ষম।

হরমুজ প্রণালিতে, যে জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল রপ্তানির এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়, শত শত জাহাজ এখনো আটকে আছে। আর পুরো অঞ্চলে ইরান ডিটারেন্ট প্রতিরোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং যেকোনো হুমকির জবাবে পাল্টা পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতি গ্রহণ করেছে। গত সপ্তাহেই ইরান কাতারের প্রধান গ্যাস স্থাপনায় হামলা চালিয়ে এর রপ্তানি সক্ষমতার ১৭ শতাংশ ধ্বংস করে দেয়। ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলি হামলার পরপরই এই হামলার ঘটনা। নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জবাবে ইরানের দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে দক্ষিণাঞ্চলের আরাদ ও দিমোনা শহরে আঘাত হানে, এতে ১৮০ জনের বেশি আহত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের লক্ষ্য এখন শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, বরং এমন একটি যুদ্ধ-উত্তর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যা প্রতিরোধক্ষমতা পুনরুদ্ধার করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেবে।

ইরানের নতুন রেড লাইন বা চূড়ান্ত সীমারেখা

ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তারা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে জানিয়েছেন, তারা জব্দ অর্থ ফেরত ও ক্ষতিপূরণ, ভবিষ্যতে আর হামলা না হওয়ার দৃঢ় নিশ্চয়তা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামো চান। ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মোরতাজাভি বলেন, তেহরান নিজের শর্তে যুদ্ধ শেষ করতে চাইবে এবং এর বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল, ক্ষতিপূরণ ও অর্থনৈতিক লিভারেজ আদায় করতে চাইবে।

মোরতাজাভি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির ওপর এই চাপ তাঁদের নতুন ভাবনা তৈরি করেছে যে বিশ্বের অন্য কিছু স্থানের মতো হয়তো আমরা (ইরান) চলাচলের জন্য ফি নিতে পারি। ইরানে এমন আলোচনা চলছে।’

বিশ্লেষকদের মতে, বড় ধরনের ছাড় ছাড়া ইরান এই প্রভাব ত্যাগ করবে না। বিশেষ করে ইরানের ধারণা, যুদ্ধের ফলে তারা এমন কিছু অর্থনৈতিক স্বস্তি পেয়েছে, যা কূটনৈতিক পথে পায়নি। শুক্রবার তেলের দাম কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন সাময়িকভাবে সমুদ্রে থাকা ১৪ কোটি ব্যারেল ইরানি তেল কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে।

যুক্তরাষ্ট্র কী চায়

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যে কারণগুলোর কথা বলেছেন, তার একটি হলো তেহরানকে পারমাণবিক বোমা অর্জন থেকে বিরত রাখা; যদিও গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধে তিনি দাবি করেছিলেন যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। গত সোমবার ট্রাম্প বলেন, তিনি এখনো চান ইরান যেন অস্ত্রমানের কাছাকাছি সমৃদ্ধ ৪০০ কেজির বেশি ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করে। ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, ওই মজুদ যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি পারমাণবিক স্থাপনার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।

অতীতে যুক্তরাষ্ট্র চাইত ইরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করুক এবং অঞ্চলজুড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করুক। আল জাজিরার সঙ্গে কথা বলা দুটি সূত্রের একটির মতে, ওয়াশিংটন এখন প্রস্তাব দিয়েছে যে ইরান তাদের ভান্ডারে ১ হাজারটি মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রাখতে পারবে, যা আগের দাবির তুলনায় ভিন্ন। তবে যেকোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি ইরানের গভীর অবিশ্বাসের মধ্য দিয়েই হতে হবে। ট্রাম্প দুই দফা ইরানে বোমা হামলা চালান যখন তাঁর দূতেরা ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন—২০২৫ সালের জুনে এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তিনি বারবার বলেছেন তাঁর লক্ষ্য শাসন পরিবর্তন।

আলোচক নিয়ে প্রশ্ন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের অনেক সদস্য নিহত হওয়ার পর, ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আলোচনায় ইরানের পক্ষে কে নেতৃত্ব দেবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন আলী লারিজানি, যিনি বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে প্রধান যোগাযোগকারী ছিলেন।

মঙ্গলবার ইরান মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদরকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়। তিনি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সাবেক কমান্ডার এবং ২০২৩ সাল থেকে এক্সপিডিয়েন্সি কাউন্সিলের উপদেষ্টা সচিব ছিলেন। ইরানবিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বাবাক বাহদাদের মতে, এই নিয়োগ ইঙ্গিত দেয় যে ভবিষ্যৎ আলোচনায় আইআরজিসির নিরাপত্তা ধারণা ও অগ্রাধিকার বেশি প্রভাব ফেলবে।

বাহদাদ বলেন, ‘সোজা কথায়, এটি আপসের প্রস্তুতির চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত মোকাবিলার প্রস্তুতির মতোই বেশি মনে হচ্ছে।’

কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্পের হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্ত তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল। কারণ, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মার্কিন মেরিন সেনা পৌঁছানোর অপেক্ষাও ছিল। গত সপ্তাহে ২ হাজার ৫০০ মেরিন এবং একটি অ্যাম্ফিবিয়াস অ্যাসল্ট বা উভচর আক্রমণ জাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। মার্চের মাঝামাঝি ট্রাম্প প্রশাসন জাপানভিত্তিক ইউএসএস ট্রিপোলি নামের আরেকটি উভচর জাহাজও পাঠানোর নির্দেশ দেয়, যাতে আরও কয়েক হাজার মেরিন সেনা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

ট্রাম্প স্থলবাহিনী পাঠাবেন কি না সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি, তবে উপসাগরের উত্তরে অবস্থিত ইরানের খারগ দ্বীপ দখলের ধারণা তিনি বিবেচনা করেছেন বলে জানা গেছে, যেখান থেকে ইরানের ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবদুল খালেক আবদুল্লাহ বলেন, ‘কূটনৈতিক আলোচনা এক বিষয়; গ্রাউন্ডে আমি যা দেখছি তা সম্পূর্ণ ভিন্ন।’

আবদুল্লাহর মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারেরা কখনোই এমন পরিস্থিতি মেনে নেবে না, যেখানে ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। কারণ, এতে দীর্ঘ মেয়াদে উপসাগরীয় জ্বালানি রপ্তানির ওপর ইরানের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হবে। আর যেহেতু তেহরান প্রণালির ওপর তার প্রভাব ছাড়বে বলে মনে হয় না, তাই কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ খুবই কম। আবদুল্লাহ বলেন, ‘এটি পুনর্দখল করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব, এবং এর একটি পথই আছে—সামরিক পথ।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত