
লন্ডনের ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের বিখ্যাত চকচকে কালো দরজার ভবনটি প্রায় ৩০০ বছরের ইতিহাসে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে বহু বাসিন্দার আগমন-প্রস্থান দেখেছে। এই ভবনে নয় বছর ছিলেন উইনস্টন চার্চিল। এরপর ১৯৮০-এর দশকজুড়ে প্রায় ১২ বছর কাটান ‘আয়রন লেডি’ মার্গারেট থ্যাচার। ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত টানা এক দশক সেখানে ছিলেন টনি ব্লেয়ার।
কিন্তু গত ১০ বছরে ব্রিটিশ নেতাদের যেন বাক্সপত্র গুছিয়ে বসার সময়ই হয়নি, তার আগেই জায়গা ছাড়তে হয়েছে পরের বাসিন্দার জন্য। ২০১৬ সাল থেকে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী এই সরকারি বাসভবনে থেকেছেন। শুধু গত চার বছরেই ছিলেন চারজন।
বেক্সিট গণভোটের পর দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই পদত্যাগ করেন ডেভিড ক্যামেরন। এরপর আসেন থেরেসা মে। তিনিও ৩ বছরের মতো দায়িত্ব পালন করে পদত্যাগ করেন। এরপর আসেন বরিস জনসন। তিনিও ৩ বছরের বেশি কিছু সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে পদত্যাগ করেন মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই।
ব্রিটেনে সবচেয়ে কম সময়—মাত্র ৪৯ দিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে পদত্যাগ করেন লিজ ট্রাস, যা ব্রিটিশ ইতিহাসে সংক্ষিপ্ততম মেয়াদ। এরপর, ঋষি সুনাক প্রথম এশীয় বংশোদ্ভূত হিসেবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন প্রায় দুই বছরের মতো। উল্লিখিত সব প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন কনজারভেটিভ পার্টির। তবে ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টিকে দীর্ঘদিন পর ক্ষমতায় আনেন কিয়ার স্টারমার। তবে এবার তিনিও পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে, ব্রেক্সিটের পর বিগত ১০ বছরে ব্রিটেন যেন প্রধানমন্ত্রীখেকো দেশে পরিণত হয়েছে। এই সময়ে ৬ জন প্রধানমন্ত্রী মেয়াদ পূর্ণ করার আগেই দায়িত্ব ছেড়েছেন।
যুক্তরাজ্যের ভোটাররা যুক্তরাষ্ট্রের মতো সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না। বরং ভোটাররা নিজেদের স্থানীয় আসনের প্রতিনিধিদের ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে পাঠান। আর যে দল ওই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন জেতে, সাধারণত সেই দলের নেতাই প্রধানমন্ত্রী হন।
রাজনৈতিক দলগুলো অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের মাধ্যমে যেকোনো সময় তাদের নেতা বদলাতে পারে, এমনকি সেই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হলেও। যদি দলের যথেষ্টসংখ্যক সদস্য তাঁর প্রতি আস্থা হারান, তবে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব। ক্ষমতাসীন দলের নেতা পদত্যাগ করলে বা পদচ্যুত হলে তিনি প্রধানমন্ত্রিত্বও হারান।
এই ব্যবস্থার ফলে সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই একজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে বদলানো সম্ভব হয়। তবে সরকারে থাকা দল পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত ক্ষমতায় বহাল থাকে। যুক্তরাজ্যের আইনে সর্বোচ্চ প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সাধারণ নির্বাচন হতে হবে, যদিও ক্ষমতাসীন সরকার চাইলে তার আগেও নির্বাচন ডাকতে পারে। সাধারণত তখনই এমনটি হয়, যখন সরকার মনে করে আরও বেশি আসন জিতে নিজেদের জনসমর্থন বাড়াতে পারবে, অথবা জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় ভোটারদের নতুন সুযোগ দেওয়ার চাপ অনুভব করে।
গত এক দশকে এমন ঘটনা বারবার ঘটেছে। ফলে একধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা যেন নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। তাহলে কী বদলে গেল?
হয়তো সবকিছুর শুরু ব্রেক্সিট থেকে। ২০১৬ সালের বিতর্কিত গণভোটে ব্রিটিশ ভোটাররা অল্প ব্যবধানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে রায় দেন। এর ফলে শুরু হয় গভীর রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস, যার প্রভাব এখনো অনুভূত হচ্ছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের নেতৃত্বে কনজারভেটিভ পার্টি ছয় বছর ধরে ক্ষমতায় ছিল। ২০১৫ সালের পুনর্নির্বাচনী প্রচারে ক্যামেরন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি ক্ষমতায় ফিরলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে সদস্যপদ নিয়ে গণভোট করবেন।
কনজারভেটিভরা নির্বাচনে জয়ী হয় এবং ক্যামেরন ডাউনিং স্ট্রিটে থেকে যান। কিন্তু গণভোট তাঁর প্রত্যাশামতো হয়নি। তিনি ‘রিমেইন’ বা ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে প্রচার করেছিলেন। ফল বিপরীত হওয়ায় ২০১৬ সালের জুলাইয়ে তিনি পদত্যাগ করেন।
ব্রেক্সিট তাঁর দলকেও বদলে দেয়। বহুদিনের কনজারভেটিভ সমর্থকরা ব্যবসাবান্ধব ও ইউরোপপন্থী দলটির সঙ্গে নিজেদের আর একাত্ম ভাবতে পারেননি। তাঁদের বড় অংশ জনতাবাদী ও ব্রেক্সিটপন্থী রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন। একই সময়ে কনজারভেটিভদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মধ্য-বামপন্থী লেবার পার্টির বহু পুরোনো সমর্থকও, বিশেষ করে ঐতিহ্যগত শ্রমজীবী ভোটাররা, ব্রেক্সিট আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান।
‘ভোট লিভ’—প্রচারণা ভোটারদের সামনে বিশাল প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। বলা হয়েছিল, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়লে অভিবাসন কমবে, অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা খাত বিপুল অর্থ পাবে এবং ব্রিটেন নতুন এক জাতীয় দিকনির্দেশনা অর্জন করবে। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারি এবং ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিঃসন্দেহে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকে আরও কঠিন করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ভোটাররা পেয়েছেন বছরের পর বছর রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা।
এই বাস্তবতাই ডুবিয়েছে থেরেসা মে’কে। ক্যামেরনের সরে দাঁড়ানোর পর ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে পড়ে। কিন্তু ব্রেক্সিট নিয়ে নিজের দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনে তিনি কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়েন। ২০১৯ সালে চোখের জলে কনজারভেটিভ নেতৃত্ব ছাড়েন এবং দলের আরেক সদস্যকে সুযোগ করে দেন।
বরিস জনসন তাঁর প্রচারণার মূল স্লোগান করেছিলেন, ‘গেট ব্রেক্সিট ডান।’ এই স্লোগান তাঁকে পর্যাপ্ত কনজারভেটিভ সমর্থন এনে দেয় নেতৃত্বের জন্য। কিন্তু ব্রেক্সিটের পর অভিবাসন কমানোর প্রতিশ্রুতি বারবার দিলেও জনসনের নেওয়া নীতির অধীনে দেশে আগত মানুষের সংখ্যা বরং রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে যায়। এতে তাঁর দল এবং সামগ্রিকভাবে ব্রিটিশ রাজনৈতিক শ্রেণির প্রতি মানুষের আস্থা বড় ধাক্কা খায়।
তবে শেষ পর্যন্ত জনসনের পতনের কারণ হয় তাঁর নিজের কর্মকাণ্ড। কোভিডকালে তিনি নিজের জারি করা একাধিক বিধিনিষেধ ভেঙেছিলেন, যার মধ্যে লকডাউনের সময় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে একাধিক সমাবেশ আয়োজন ছিল। এই কেলেঙ্কারি দ্রুত ‘পার্টিগেট’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। শেষ আঘাত আসে তখন, যখন যৌন নিপীড়নের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও জনসন এক কনজারভেটিভ রাজনীতিককে পদোন্নতি দেন। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি পদত্যাগ করেন।
তাঁর উত্তরসূরি লিজ ট্রাস গড়েন ব্রিটিশ ইতিহাসের সবচেয়ে স্বল্পস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড। তাঁর কুখ্যাত ‘মিনি-বাজেট’—যাতে অর্থায়নের সুস্পষ্ট উৎস ছাড়া বড় করছাড়ের প্রস্তাব ছিল—আর্থিক বাজারে ধস নামায় এবং ব্রিটিশদের মর্টগেজ সুদের হার বাড়িয়ে দেয়। মাত্র ৪৫ দিন দায়িত্বে থাকার পর ২০২২ সালের অক্টোবরে তিনি পদত্যাগ করেন।
ট্রাসের পর আসেন ঋষি সুনাক। তিনি প্রায় দুই বছর টিকে ছিলেন, কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট সামাল দিতে পারেননি। মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে। ১৪ বছর ধরে কনজারভেটিভ শাসনের পর সুনাক ব্রিটিশ জনগণকে বোঝাতে ব্যর্থ হন যে তাঁদের আরও একই ধরনের সরকার প্রয়োজন।
দীর্ঘদিনের বিরোধী দল লেবার পার্টি ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সাধারণ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পায়। দলের নেতা কিয়ার স্টারমার প্রধানমন্ত্রী হন এবং এখনো দায়িত্বে আছেন। কিন্তু দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তাঁর সরকারও ইতোমধ্যে টালমাটাল অবস্থায় পৌঁছেছে। আর এই অবস্থায় তিনিও পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।
তাঁর সময়কাল চিহ্নিত হয়েছে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন, নীতিগত অবস্থান বদল এবং পরিষ্কার দিকনির্দেশনার অভাবে, এমন এক সময়ে যখন ব্রিটেন বিশাল সব চ্যালেঞ্জের মুখে। স্টারমারের সরকার বিভিন্ন কেলেঙ্কারিতেও জড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের বন্ধু পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার আগে তিনি কী জানতেন, কী জানতেন না এবং কখন জানতেন, তা নিয়ে বিতর্ক।
তবে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় নির্বাচনের ফলই হয়তো স্টারমারের নেতৃত্বের পরিণতি নির্ধারণ করেছে। স্থানীয় কাউন্সিল ও আঞ্চলিক সংসদীয় আসনের সাম্প্রতিক নির্বাচনে লেবার ভয়াবহ ফল করেছে। এসব নির্বাচন প্রায়ই জনমতের সূচক হিসেবে দেখা হয়, অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মতো। লেবারের একাধিক শীর্ষ নেতা পদত্যাগ করেছেন এবং দলের খারাপ ফলাফলের দায়ে স্টারমারের সরে দাঁড়ানোর দাবি তুলেছিলেন।
তথ্যসূত্র: বিবিসি ও সিবিএস নিউজ

গত ১৮ জুন ভোরে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে ইউক্রেনের শতাধিক ড্রোনের হামলায় রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। যুদ্ধ শুরুর পর এটিই ছিল মস্কোর ওপর ইউক্রেনের অন্যতম বৃহৎ ড্রোন হামলা।
১ দিন আগে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনার মুখে সাধারণত বিশ্বের অন্যান্য নেতারা যেখানে সংযত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে থাকেন, সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আক্রমণ ও উসকানির জবাবে নজিরবিহীনভাবে পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছেন তিনি।
১ দিন আগে
সুদূরপ্রসারী সামরিক ফলাফলের বাইরেও কিছু যুদ্ধের এমন ক্ষমতা থাকে, যা পুরো অঞ্চলকে নতুনভাবে গড়ে দিতে পারে। ১৯৯০ সালে ইরাকের কুয়েত আক্রমণ আরব আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তা বলয়ের চারপাশে পুনর্গঠিত করেছিল। আর ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণ এমন এক সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ঢেউ তৈরি করেছ
১ দিন আগে
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফর শুরু করছেন আজ রোববার থেকে। এই সফরে তিনি মালয়েশিয়া ও চীনে যাচ্ছেন। এই খবর ভারতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। তাদের দৃষ্টিতে, ভারতকে এড়িয়ে তারেক রহমানের চীনমুখী কূটনৈতিক তৎপরতা তাঁর পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারের একটি ইঙ্গিত।
১ দিন আগে