Ajker Patrika

উত্তর কোরিয়ার নীরব ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, ইউক্রেনের জন্য কেন হুমকি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
উত্তর কোরিয়ার নীরব ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, ইউক্রেনের জন্য কেন হুমকি
উত্তর কোরিয়ার তৈরি একটি হোয়াসং-১৭ আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। ছবি: কেএনএস

সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে উত্তর কোরিয়া। তবে বিষয়টি নজর কেড়েছে ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন বা প্রদর্শনীর কারণে নয়, বরং পরীক্ষা নিয়ে দেশটির অস্বাভাবিক নীরবতায়। চলতি মাসে এক সপ্তাহের ব্যবধানে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সামরিক বাহিনী উত্তর কোরিয়ার দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের কথা জানিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, দুটি পরীক্ষাই দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর ওনসান এলাকা থেকে চালানো হয়েছে। তবে এসব পরীক্ষা নিয়ে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।

সাধারণত সফল বা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র পরীক্ষা হলে পিয়ংইয়ং দ্রুত তা প্রচার করে। ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ছবি, কারিগরি তথ্য এবং নেতা কিম জং উনের পরীক্ষা তদারকির ছবিও প্রকাশ করা হয়। এর মাধ্যমে বিদেশি প্রতিপক্ষকে সামরিক সক্ষমতার বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি দেশের ভেতরেও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও শক্তির প্রদর্শন করা হয়।

সুইডেনের ইনস্টিটিউট ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পলিসির স্টকহোম সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান অ্যান্ড ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের প্রধান জগন্নাথ পান্ডার মতে, এই নীরবতা তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘উত্তর কোরিয়া সাধারণত সফল ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা অভ্যন্তরীণ বৈধতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সংকেত এবং বিদেশি শক্তিকে পরোক্ষ বার্তা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এবার তা হয়নি। এই নীরবতার অর্থ যে পরীক্ষা ব্যর্থ হয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। পিয়ংইয়ং হয়তো এমন উন্নয়নমূলক বা কারিগরি পরীক্ষা চালাচ্ছে, যেগুলো নির্দিষ্ট পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত প্রচারের প্রয়োজন নেই।’

সাম্প্রতিক এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাগুলো এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সেনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করছে পিয়ংইয়ং। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, উত্তর কোরিয়া কি ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পাওয়া বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র আরও উন্নত করছে?

গত বুধবার ওনসান থেকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ৭০০ কিলোমিটার পূর্বদিকে গিয়ে জাপান সাগরে পড়েছে বলে জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ। এর ছয় দিন আগেও একই এলাকা থেকে জাপান সাগরের দিকে একটি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল।

দুটি পরীক্ষার সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বার্ষিক ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ সামরিক মহড়ার (১৭ থেকে ২৭ আগস্ট) ঠিক আগে। এবারের মহড়ায় প্রায় ১৮ হাজার দক্ষিণ কোরীয় সেনার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারাও অংশ নেবে।

উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন নিয়ে ইউক্রেনের জন্য উদ্বেগের কারণ আরও গভীর। রাশিয়া ইতিমধ্যে ইউক্রেনের যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, চলতি মাসে জাপোরিঝঝিয়া ও দনিপ্রোপেত্রোভস্কে হামলায় পিয়ংইয়ংয়ের সরবরাহ করা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এসব হামলায় ছয়জন নিহত হন, যাঁদের মধ্যে ১৫ বছরের এক কিশোরও ছিল।

ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, উত্তর কোরিয়ার একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট রাশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে মোতায়েন শুরু করেছে। ইউনিটটির কাছে ১২০টি পর্যন্ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ছয়টি লঞ্চার থাকতে পারে। একই সঙ্গে রাশিয়ায় আরও ৪০টি কেএন-২৩ ও কেএন-২৪ ক্ষেপণাস্ত্র পাঠিয়েছে উত্তর কোরিয়া।

কেএন-২৩ (হোয়াসং-১১এ নামেও পরিচিত) একটি সলিড-ফুয়েল স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এর পাল্লা প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার। রাশিয়ার ইস্কান্দার-এম ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে এর সাদৃশ্য থাকায় এটি বিদেশি সহায়তায় তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইউক্রেন যুদ্ধ উত্তর কোরিয়ার জন্য ক্ষেপণাস্ত্রের বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের কার্যকারিতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে এসব অস্ত্র কীভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করছে, বিমান প্রতিরক্ষা কতটা সফলভাবে সেগুলো ঠেকাতে পারছে, নির্দেশনা ও নির্ভুলতা কেমন—এসব তথ্য পিয়ংইয়ং পেতে পারে।

জগন্নাথ পান্ডার ভাষায়, এর ফলে একটি ‘ফিডব্যাক লুপ’ তৈরি হচ্ছে। উত্তর কোরিয়া বাস্তব যুদ্ধের তথ্য সংগ্রহ করে ক্ষেপণাস্ত্রের নির্ভুলতা, নির্দেশনা, নির্ভরযোগ্যতা, বাধা দেওয়ার সক্ষমতা এবং ওয়ারহেডের কার্যকারিতা সম্পর্কে ধারণা নিতে পারে। পরে এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ক্ষেপণাস্ত্রে পরিবর্তন আনা সম্ভব।

কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের জ্যেষ্ঠ গবেষক হং মিনের মতে, একই স্থান থেকে ছয় দিনের ব্যবধানে একক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের বিষয়টি উন্নত সংস্করণের পরীক্ষার সম্ভাবনাকে জোরালো করে।

উন্নত কেএন-২৩ সংস্করণে বেশি পাল্লা, শেষ পর্যায়ে বেশি গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা, উন্নত নির্ভুলতা বা টার্মিনাল পর্যায়ে ভিন্ন গতির মতো পরিবর্তন থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আরেকটি সম্ভাবনা হলো, এগুলো উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষা। উত্তর কোরিয়া যদি নিজেদের ব্যবহারের পাশাপাশি রাশিয়াকে সরবরাহের জন্যও বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে, তাহলে উৎপাদিত অস্ত্রের প্রপালশন, নির্দেশনা, কাঠামোগত সক্ষমতা ও নির্ভুলতা যাচাই করতে নিয়মিত পরীক্ষা প্রয়োজন।

জুনের শুরুতে একটি অস্ত্র কারখানা পরিদর্শনের সময় কিম জং উন ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন ২ দশমিক ৫ গুণ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরপর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম হোয়াসাল-২ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য পুলহোয়াসাল-৩-৩১-এর মতো নতুন অস্ত্রের প্রচারও করেছে।

তাই সাম্প্রতিক পরীক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনো স্পষ্ট নয়। ভবিষ্যতে একই ধরনের আরও পরীক্ষা হলে সেগুলোর ধারাবাহিকতা, উড্ডয়নপথ ও কার্যকারিতার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেই বোঝা যেতে পারে—উত্তর কোরিয়া পুরোনো অস্ত্রের মান যাচাই করছে, নতুন সংস্করণ উন্নত করছে, নাকি রাশিয়াসহ অন্য দেশে সরবরাহের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করছে।

তবে যে কারণেই এই পরীক্ষা হয়ে থাকুক, ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি ইউরোপের জন্যও নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পিয়ংইয়ং যদি ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়াতে পারে, ভবিষ্যতে সেই উন্নত অস্ত্র রাশিয়ার হাতে ইউক্রেনের বাইরেও ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তথ্যসূত্র: দি ইনডিপেনডেন্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত