Ajker Patrika

এআইয়ের গতিপথ বদলে দেওয়া ১০ দিন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
এআইয়ের গতিপথ বদলে দেওয়া ১০ দিন
ছবি: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে আরও শক্তিশালী করার প্রতিযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে সিলিকন ভ্যালির মূলমন্ত্র ছিল—দ্রুত এগিয়ে যাও, প্রয়োজনে ঝুঁকি নাও। কিন্তু মাত্র ১০ দিনের ধারাবাহিক কিছু ঘটনায় সেই ধারণাই বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশ্বের শীর্ষ এআই গবেষণাগারগুলোতে তৈরি প্রযুক্তি মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন গবেষক ও প্রযুক্তি নেতাদের কেউ কেউ।

সম্প্রতি অ্যানথ্রপিক-এর এক গবেষক প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে দিয়ে সতর্ক করেছেন—এআই উন্নয়নের বর্তমান গতি আগামী এক দশকের মধ্যেই মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হতে পারে। একই প্রতিষ্ঠানের আরেক গবেষক বলেছেন, এআই-এর মাধ্যমে মানুষের বিলুপ্তির সম্ভাবনা ১০ শতাংশেরও বেশি। এর পাশাপাশি এআই এজেন্টদের দলবদ্ধভাবে কাজ করা, নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়া এবং অন্য প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার সিস্টেমে অননুমোদিত প্রবেশের ঘটনাও সামনে এসেছে।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে অন্যান্য এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারাও খুবই বিরলভাবে একই অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। এ ক্ষেত্রে অ্যানথ্রপিক, ওপেনএআই, গুগল ডিপমাইন্ড, মাইক্রোসফট ও এক্সএআই-এর শীর্ষ ব্যক্তিরা আরও সক্ষম এআই ব্যবস্থার উন্নয়ন কিছুটা ধীর করার পক্ষে মত দিয়েছেন। এআই নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা কিছু গবেষকের মতে, ৮০ বছরেরও বেশি সময় আগে পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের পরও মানবসভ্যতা নিজের অস্তিত্ব নিয়ে এমন গুরুতর প্রশ্নের মুখোমুখি হয়নি।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানকে পারমাণবিক বোমা তৈরির মার্কিন প্রকল্পের নেতৃত্ব দেওয়া পদার্থবিদ জে রবার্ট ওপেনহাইমারের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল। অল্টম্যান তখন বলেছিলেন, এআই দীর্ঘ সময়ের জন্য মানব ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেবে এবং এর সঙ্গে বড় ধরনের দায়িত্বও জড়িয়ে আছে।

রোববার এক প্রতিবেদনে (২০ সেপ্টেম্বর) রয়টার্স জানায়, চলমান এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ‘কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা’ বা এজিআই। ধারণাটি হলো—এমন এআই তৈরি করা, যা মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজেদের আরও সক্ষম সংস্করণ তৈরি করতে পারবে। গবেষকদের সাম্প্রতিক কিছু পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এজিআই ধারণার চেয়েও দ্রুত বাস্তব হয়ে উঠতে পারে। এমনকি এটি হতে পারে মাত্র তিন বছরের মধ্যেই। এতে রাজনীতিক ও প্রযুক্তি খাতের নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।

অ্যানথ্রপিকের সাবেক গবেষক জো বেন্টন বলেন, এআই যেভাবে প্রশিক্ষিত হচ্ছে, সেই মাত্রায় এর ওপর কার্যকর নজরদারি করা সম্ভব নয়। তাঁর আশঙ্কা, উন্নয়নের গতি অব্যাহত থাকলে সমস্যাগুলো শনাক্ত ও সমাধান করার আগেই নতুন প্রযুক্তি আরও এগিয়ে যাবে।

গত ৩ সেপ্টেম্বর ওপেনএআইয়ের নতুন এআই মডেল ‘অ্যাস্ট্রা’ উন্মোচনের পর উদ্বেগ আরও তীব্র হয়। প্রতিষ্ঠানটি একই সময়ে স্বীকার করে, তারা নিজেদের তৈরি ক্রমশ শক্তিশালী এআই ব্যবস্থাগুলো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ বা পর্যবেক্ষণ করতে পারছে না। ওপেনএআই-এর প্রধান বিজ্ঞানী জাকুব পাচোকি বলেন, মডেল যত শক্তিশালী হচ্ছে, সেটি আসলে কী করতে সক্ষম—তা নির্ভুলভাবে বোঝাও তত কঠিন হয়ে পড়ছে।

গত ৮ সেপ্টেম্বর অ্যানথ্রপিকের গবেষক জ্যাকব কক্সন পদত্যাগ করে অভিযোগ করেন, এআই গবেষণাগারগুলো মানুষের জীবন নিয়ে জুয়া খেলছে। তাঁর পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআই উন্নয়ন ধীর করার বিরোধিতা করে বলেন, এতে চীনেরই সুবিধা হবে। চীন অবশ্য এআই নিরাপত্তায় নিয়ন্ত্রক কাঠামো, রাষ্ট্রীয় মানদণ্ড, নিরাপত্তা মূল্যায়ন ও বাইরের পরীক্ষার প্রস্তাব দিয়েছে।

এদিকে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের কর্মীদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। পরীক্ষার সময় এআই এজেন্টদের নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে প্রবেশের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। ওপেনএআই জানিয়েছে, তাদের কিছু এজেন্ট ‘হাগিং ফেস’-এর সিস্টেমে অননুমোদিত প্রবেশ করেছিল। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি ঘটনার তথ্য সামনে আসে।

গত ১২ সেপ্টেম্বর অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানান। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আগামী ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যেই এআই এজেন্টদের কোনো একটি সমষ্টি পুরো ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো সক্ষম হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে এক্সএআই-এর ইলন মাস্ক, ওপেনএআই-এর স্যাম অল্টম্যান ও ডিপমাইন্ড-এর ডেমিস হাসাবিস সহ কয়েকজন শীর্ষ প্রযুক্তি নেতা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাইরের প্রতিষ্ঠানকে এআই সিস্টেম পরীক্ষা করার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং এআই উন্নয়ন থামানোর ধারণার বিরোধিতা করেছেন। মেটার মার্ক জাকারবার্গও শিল্পজুড়ে সমন্বিতভাবে গতি কমানোর বদলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের দায়িত্বে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

মাইক্রোসফটের এআই প্রধান মুস্তাফা সুলেমানও সতর্ক করে বলেছেন, সুপারইন্টেলিজেন্স নিয়ন্ত্রণ করা একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত